কালীগঞ্জের একই গ্রামের চার প্রতিবন্ধীর জীবনসংগ্রাম, সহযোগিতার অপেক্ষায় চার পরিবার

কালীগঞ্জের একই গ্রামের চার প্রতিবন্ধীর জীবনসংগ্রাম, সহযোগিতার অপেক্ষায় চার পরিবার

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের উল্লা গ্রামে চার প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন কাটছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। দারিদ্র্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসার অভাবে তাঁদের প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে কঠিন। কারও প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ও কানে শোনার যন্ত্র, কারও প্রয়োজন চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার। আবার কেউ ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ির জরাজীর্ণ ঘরে দিন কাটাচ্ছেন।

সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও চিকিৎসা, যাতায়াত ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে তা যথেষ্ট নয়। তাই নিজেদের জীবন কিছুটা সহজ করতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন চার পরিবারের সদস্যরা।

সম্প্রতি উল্লা গ্রামে গিয়ে আট বছর বয়সী আবু রায়হান, ২৭ বছর বয়সী সাথী খাতুন, ২১ বছর বয়সী আলীরাজ ও ৪০ বছর বয়সী সাক্ষী খাতুনের জীবনসংগ্রামের চিত্র উঠে আসে।

আবু রায়হানের স্বপ্ন শুনতে পাওয়া ও স্কুলে ফেরা

উল্লা গ্রামের আসাদুল ইসলাম ও সিমা খাতুন দম্পতির বড় সন্তান আবু রায়হান। আট বছর বয়সী শিশুটি শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী। জন্মের পর থেকেই তার শারীরিক সমস্যার বিষয়টি পরিবারের নজরে আসে। উন্নত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় হিয়ারিং মেশিনের অভাবে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা ও অন্য শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না সে।

আসাদুল ইসলাম পেশায় ক্ষেতমজুর। দিনমজুরির আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। সন্তানের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে গেলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আবু রায়হানের জন্য একটি ভালো মানের হিয়ারিং মেশিন প্রয়োজন। বিভিন্ন মানের যন্ত্রের দাম ৩০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রের অভাবে শিশুটির পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। স্কুলে সহপাঠীদের উপহাসের শিকার হওয়ায় একপর্যায়ে সে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

আবু রায়হানের মা সিমা খাতুন বলেন, ছেলেকে চিকিৎসা করাতে অনেক জায়গায় গিয়েছি। ধারদেনা করেও কোনো সমাধান করতে পারিনি। এখন আর সামর্থ্য নেই। একটি হিয়ারিং মেশিন কিনে দিতে পারলে হয়তো সে কিছুটা শুনতে পারবে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। আমরা চাই, আমাদের ছেলে পড়াশোনা করুক, অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশুক। এ জন্য সরকার ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা চাই।

সাথী খাতুনের প্রয়োজন চিকিৎসা ও ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার

আবু রায়হানদের বাড়ির পাশেই বসবাস করেন ২৭ বছর বয়সী সাথী খাতুন। তিনি ফরহাদ উল্লাহ ও রেবেকা খাতুন দম্পতির মেয়ে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শৈশব থেকেই তিনি শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছেন। বর্তমানে কোমরের নিচের অংশ কার্যত অচল। নিজে হাঁটাচলা করতে পারেন না, কথা বলতেও সমস্যা হয়।

সাথীর বাবা পেশায় কৃষক। মেয়ের চিকিৎসার জন্য জমিজমা বিক্রি করে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েছেন। বর্তমানে বসতভিটা ছাড়া পরিবারের তেমন কোনো সম্পদ নেই।

সাথীর মা-বাবা জানান, একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার পেলে মেয়ের চলাচল অনেকটা সহজ হতো। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেটি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁরা মেয়ের চিকিৎসা ও একটি হুইলচেয়ারের জন্য সহযোগিতা কামনা করেছেন।

আলীরাজের চলার পথেও প্রতিকূলতা

উল্লা গ্রামের আরেক বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী আলীরাজ। দুই হাতে লাঠির ওপর ভর দিয়ে কষ্ট করে চলাফেরা করেন তিনি। জীবিকার নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে।

আলীরাজ তারিক হোসেন ও আন্না খাতুন দম্পতির বড় ছেলে। একসময় কালীগঞ্জ শহরের একটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও আর্থিক সংকট ও সহপাঠীদের উপহাসের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর মা। স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চিত অর্থ ও সম্পদ শেষ হয়ে গেছে বলে জানান বাবা তারিক হোসেন।

তিনি বলেন, স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন বসতভিটা ছাড়া কিছুই নেই। ছেলেটা ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। তার চিকিৎসা করানোরও সামর্থ্য নেই। একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে ছেলের কষ্ট কিছুটা কমত।

ছোট মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় সাক্ষী খাতুন

চারজনের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি ৪০ বছর বয়সী সাক্ষী খাতুন। জন্ম থেকেই তাঁর দুটি পা নেই। দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয় তাঁকে।

প্রায় সাত বছর আগে পাশের কোলা ইউনিয়নের আকির হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের চার বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে একপর্যায়ে স্বামী তাঁদের ছেড়ে চলে যান। পরে অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এরপর থেকে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন সাক্ষী। ছোট মেয়েকে নিয়ে একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন তিনি। নিজের চলাফেরা, সন্তানের লালন-পালন ও সংসারের ব্যয় মেটাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাঁকে।

সাক্ষীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, মেয়ের জন্ম থেকেই দুটি পা নেই। ভেবেছিলাম বিয়ের পর তার একটা সংসার হবে। কিন্তু স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন ছোট্ট নাতনিকে নিয়ে আমার বাড়িতে থাকে। আমিও গরিব কৃষক। নিজের সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। মেয়ের জন্য একটি হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

মা লিলি খাতুন বলেন, মেয়ের কষ্ট দেখলে বুক ফেটে যায়। ছোট শিশুকে নিয়ে সে আমাদের বাড়িতে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা বয়স্ক মানুষ, কত দিন তাকে সহযোগিতা করতে পারব জানি না। মেয়ের চলাচলের জন্য একটি হুইলচেয়ার ও স্থায়ীভাবে বেঁচে থাকার মতো ব্যবস্থা হলে তার কষ্ট কিছুটা কমত।

সহায়তার অপেক্ষায় চার পরিবার

উল্লা গ্রামের এই চারজনের প্রয়োজন ভিন্ন হলেও তাঁদের প্রত্যেকেরই প্রয়োজন সহযোগিতা। আবু রায়হানের উন্নত চিকিৎসা ও হিয়ারিং মেশিন প্রয়োজন। সাথী খাতুন ও আলীরাজের প্রয়োজন চিকিৎসা এবং চলাচলের উপযোগী হুইলচেয়ার। অন্যদিকে সাক্ষী খাতুনের প্রয়োজন হুইলচেয়ার, আর্থিক সহায়তা ও মেয়েকে নিয়ে নিরাপদে জীবনযাপনের ব্যবস্থা।

পরিবারগুলোর দাবি, তাঁরা সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সেই অর্থ যথেষ্ট নয়। তাই বিশেষ চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা পাওয়া জরুরি।

কালীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, উল্লা গ্রামের চারজনেরই প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র রয়েছে এবং তাঁরা সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। আবু রায়হানের চিকিৎসা ও হিয়ারিং মেশিনের প্রয়োজনের বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। পরিবার আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানানো হবে। অন্য তিনজনের চিকিৎসা ও হুইলচেয়ারের প্রয়োজনের বিষয়েও আবেদন পেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানানো হবে। সরকারি নিয়ম ও বরাদ্দ অনুযায়ী সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চারটি পরিবারের প্রত্যাশা, সরকারি দপ্তর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাঁদের পাশে দাঁড়াবেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, চলাচলের উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে চারটি পরিবারের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।

আরও পড়ুন:

আরো পড়ুন
ঝিনাইদহ মহেশপুর
কালীগঞ্জ সাজাপ্রাপ্ত
ঝিনাইদহে খামার থেকে ট্রাকে করে ৬ গরু চুরি, দিশেহারা কৃষক তারিকুল
আরো পড়ুন
শৈলকুপায় ডোপ টেস্ট
ঝিনাইদহে তিন দিনব্যাপী পুষ্টি মেলা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে টায়ারে আগুন, ছাত্রলীগ কর্মী আটক
আরো পড়ুন
Scroll to Top