পরিত্যক্ত সুন্দরপুর

এক যুগ ধরে কার্যত বন্ধ কালীগঞ্জের সুন্দরপুর রেলস্টেশন, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

কালীগঞ্জ প্রতিনিধি

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

একসময় ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের কোলাহল আর ব্যস্ততায় মুখর থাকত ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর রেলওয়ে স্টেশন। প্রতিদিন পাঁচটি ট্রেনের যাত্রাবিরতি ছিল এখানে। আশপাশের গ্রামের হাজারো মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের চলাচলের অন্যতম ভরসা ছিল স্টেশনটি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ব্যস্ত স্টেশন এখন প্রায় পরিত্যক্ত। দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কালীগঞ্জ উপজেলায় মোট তিনটি রেলওয়ে স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি চালু থাকলেও সুন্দরপুর স্টেশনটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ। রেলওয়ের হিসাবে স্টেশনটি অলাভজনক হিসেবে চিহ্নিত। লোকসান ও জনবল সংকটসহ নানা কারণ দেখিয়ে ২০১২ সালের দিকে স্টেশনটিতে অধিকাংশ ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় স্টেশনটির কর্মচাঞ্চল্য।

এক যুগ ধরে কার্যত বন্ধ কালীগঞ্জের সুন্দরপুর রেলস্টেশন, দুর্ভোগে হাজারো মানুষস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫১ সালে সুন্দরপুর রেলওয়ে স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়। একসময় প্রতিদিন দিন-রাত মিলিয়ে পাঁচটি ট্রেন এখানে থামত। যাত্রী ওঠানামার পাশাপাশি এলাকার কৃষিপণ্য ট্রেনে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। নিম্ন আয়ের মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীদের কাছে স্বল্প খরচে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল রেলপথ। কিন্তু প্রায় এক যুগ আগে অধিকাংশ ট্রেনের যাত্রাবিরতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ।

পরে স্থানীয়দের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার রেল মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর উদ্যোগে দুপুর ২টার দিকে মহানন্দা ট্রেনের যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা হয় বলে জানান স্থানীয়রা। তবে অন্য ট্রেনগুলোর যাত্রাবিরতি বন্ধ থাকায় আগের মতো রেলসেবা আর ফিরে আসেনি।

বর্তমানে সুন্দরপুর রেলওয়ে স্টেশনে নিয়মিত কোনো স্টেশন মাস্টার দায়িত্ব পালন করেন না। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে টিকিট কাউন্টারও। যাত্রীদের অভিযোগ, স্টেশন থেকে টিকিট সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় অনেক সময় ট্রেনে উঠে টিকিট পরীক্ষকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয়। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক টিকিট ব্যবস্থাপনাও।

সরেজমিনে দেখা যায়, একসময়ের ব্যস্ত স্টেশনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। স্টেশন ভবনের দরজা-জানালা, ঘরের টিন, লোহার রড, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মালামাল চুরি হয়ে গেছে। ভাঙাচোরা ভবন, আগাছা, ময়লা-আবর্জনা ও ঝোপঝাড়ে পুরো স্টেশন এলাকা যেন পরিত্যক্ত স্থানে পরিণত হয়েছে।

এক যুগ ধরে কার্যত বন্ধ কালীগঞ্জের সুন্দরপুর রেলস্টেশন, দুর্ভোগে হাজারো মানুষশুধু অবকাঠামোই নয়, স্টেশনের আশপাশের রেলওয়ের জমিও বেদখল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ স্টেশনের দুই পাশের জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করছেন। এমনকি প্ল্যাটফর্মের ওপরও ধান, পাট ও তিলসহ বিভিন্ন ফসল শুকাতে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও জমা করে রাখা হয়েছে গোখাদ্যের খড় ও বিচালির স্তূপ। এতে যাত্রীদের চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সুন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহেল হোসেন বলেন, ছোটবেলায় দেখেছেন, এই স্টেশন থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করতেন। স্টেশনজুড়ে সব সময় মানুষের ভিড় ও প্রাণচাঞ্চল্য থাকত। অথচ আজ সেই স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ। পরিবেশও ভুতুড়ে হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে স্টেশন এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে। অরক্ষিত পরিবেশে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের আশঙ্কাও রয়েছে। দীর্ঘদিন কার্যকর তদারকি না থাকায় স্টেশনটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদ একের পর এক হারিয়ে গেলেও তা রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ তাঁদের।

স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে। একসময় নিম্ন আয়ের মানুষ অল্প খরচে ট্রেনে যাতায়াত করতে পারতেন। শিক্ষার্থীরা সহজে স্কুল-কলেজে যেতেন। ব্যবসায়ীরা কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মালামাল পরিবহনে রেলপথ ব্যবহার করতেন। এখন তাঁদের অনেককেই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই অপচয় হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশে রেলওয়ের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে রেলপথ দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগের মধ্যে সুন্দরপুরের মতো একটি স্টেশন এভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় হতাশ স্থানীয় বাসিন্দারা।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সুন্দরপুর রেলওয়ে স্টেশনে একজন স্টেশন মাস্টার নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি স্টেশন ভবন ও প্ল্যাটফর্ম সংস্কার, রেলওয়ের জমি উদ্ধার, চুরি হওয়া সম্পদের বিষয়ে তদন্ত এবং স্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে আগের মতো একাধিক ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালুর উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন:

আরো পড়ুন
কালীগঞ্জে সরকারি খালের জায়গায় ড্রেন নির্মাণ, পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
আরো পড়ুন
মুসা মিয়া
ঝিনাইদহ ভিক্ষার
কালীগঞ্জে
আরো পড়ুন
কালীগঞ্জ থানার বিএনপি নেতা
কালীগঞ্জের একই গ্রামের চার প্রতিবন্ধীর জীবনসংগ্রাম, সহযোগিতার অপেক্ষায় চার পরিবার
আরো পড়ুন
Scroll to Top