আব্দুল জব্বার ও ওয়ালিউল্লা, শৈলকুপা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত রূপসী ঝিনাইদহ জেলার এক অনন্য রত্ন শৈলকুপা উপজেলা। আঁকাবাঁকা কুমার নদের পলি-বিধৌত এই প্রাচীন ভূখণ্ডটি শুধু একটি সাধারণ প্রশাসনিক অঞ্চলই নয়, বরং এটি হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। আদিম অন্ধকার কেটে মধ্যযুগের সুলতানি শাসন, ব্রিটিশ বিরোধী নীল বিদ্রোহের উত্তাল দিন, এবং ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ—ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে শৈলকুপার মানুষ দেখিয়েছে চরম বীরত্ব ও স্বকীয়তা। দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠ, প্রাচীন মঠ-মসজিদের নান্দনিকতা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং দেশবরেণ্য বহু কৃতী সন্তানের পদচারণায় ধন্য এই জনপদ। ১৫০০ থেকে ২০০০ শব্দের এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা শৈলকুপার নামকরণের আদি ইতিহাস থেকে শুরু করে এর ভূপ্রকৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি এবং গৌরবোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বদের এক পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্যিক চিত্র তুলে ধরব।
নামকরণ এবং ভৌগোলিক রূপরেখা
শৈলকুপা নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং ভাষা গবেষকদের মধ্যে একাধিক মনোগ্রাহী মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং লোকগ্রাহ্য মতটি জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা কুমার নদ-এর সাথে।
• প্রথম মত (মাছ শিকারের ইতিহাস): প্রাচীনকালে কুমার নদী এবং এর সংলগ্ন বিল ও জলাশয়গুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিশাল আকৃতির ‘শৈল’ (শোল) মাছ পাওয়া যেত। বর্ষাকালে বা পানি কমে গেলে স্থানীয় আদিবাসী ও জেলেরা টেঁটা, কোচ বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এই মাছ ‘কুঁপিয়ে’ (আঘাত করে) শিকার করত। এই ‘শৈল মাছ’ এবং মাছ ‘কোপানো’ বা ‘কুপা’ শব্দ দুটির স্থানীয় মেলবন্ধনেই কালক্রমে এলাকাটি ‘শৈলকুপা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
• দ্বিতীয় মত (নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ): কোনো কোনো গবেষকের মতে, এই অঞ্চলের প্রাচীন রাজবংশ বা কোনো বিশেষ সামন্ত প্রভুর নামানুসারে অথবা ‘শৈল’ (পাথর বা পাহাড় সদৃশ উঁচু ঢিবি) এবং ‘কুপ’ (কূয়া বা গভীর জলাশয়) থেকে এই নামের উৎপত্তি হতে পারে। তবে লোকমানসে কুমার নদের মাছ শিকারের গল্পটিই সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা:
শৈলকুপা উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। এটি ২৩°৪১’ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৩°৫৫’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°১১’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৮৯°২৫’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এর মোট আয়তন প্রায় ৩৭৩.৪২ বর্গ কিলোমিটার। উপজেলার উত্তর সীমান্তে রয়েছে কুষ্টিয়া সদর ও খোকসা উপজেলা এবং রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা; দক্ষিণ সীমান্তে ঝিনাইদহ সদর ও মাগুরা সদর উপজেলা; পূর্ব সীমান্তে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা এবং পশ্চিম সীমান্তে হরিণাকুণ্ডু ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি মূলত পলিমাটি দ্বারা গঠিত এক উর্বর সমভূমি।
শৈলকুপার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস
শৈলকুপার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতার বহু অজানা অধ্যায়। গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিকদের বিবরণীতে উল্লিখিত কিংবদন্তির ‘গঙ্গারিডাই’ বা গাঙ্গেয় রাজত্বের অববাহিকায় এই অঞ্চলের অবস্থান ছিল।
• পাল ও সেন আমল: সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাল ও সেন রাজাদের শাসনামলে শৈলকুপা একটি বর্ধিষ্ণু অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেন রাজা বল্লাল সেনের আমলে এই অঞ্চলে কুলীন ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ সমাজের পত্তন ঘটে। এই সময়েই এই অঞ্চলে বেশ কিছু দুর্গ, পরিখা এবং দিঘি খনন করা হয়, যার ধ্বংসাবশেষ আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
• সুলতানি ও মোঘল আমল (ইসলামের আগমন): তেরো শতকের শুরুতে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর ক্রমান্বয়ে এই অঞ্চলে সুফি-সাধক এবং পীর-আউলিয়াদের আগমন ঘটে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে শৈলকুপা অঞ্চলের ইসলাম ধর্মের ব্যাপক প্রচার ঘটে। বিশেষ করে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং তাঁর পুত্র সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত শাহের আমলে (১৫১৯-১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ) শৈলকুপা বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়। মোঘল আমলে এটি সুবা বাংলার যশোর সরকারের অধীনে একটি পরগনা হিসেবে শাসিত হতো।
ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন
শৈলকুপার প্রাচীনত্ব ও স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ ছড়িয়ে আছে এর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে।
• শৈলকুপা শাহী মসজিদ: এটি উপজেলার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্থাপত্য। সুলতানি আমলের স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন এই মসজিদটি। সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত শাহের রাজত্বকালে এটি নির্মিত হয়। মসজিদটির দেয়ালগুলো বেশ পুরু এবং এর চার কোণায় রয়েছে ৪টি সুদৃশ্য বৃত্তাকার অলঙ্কৃত মিনার। এর প্রবেশদ্বার এবং ভেতরের মিহরাবে পোড়ামাটির (টেরাকোটা) লতাপাতা ও ফুলের অত্যন্ত চমৎকার কারুকার্য রয়েছে, যা মধ্যযুগীয় বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের গৌরব বহন করে।
• হরিহরার গড়: উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে হরিহরা গ্রামে এই প্রাচীন প্রত্নস্থলটি অবস্থিত। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, এটি ছিল প্রাচীন স্থানীয় রাজা হরিহরের রাজবাড়ির চারপাশের প্রতিরক্ষা প্রাচীর বা গড়। এখানে প্রায় ৫০টিরও বেশি উঁচু মাটির ঢিবি এবং গভীর পরিখা বা খাদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, যথাযথ খননকার্য চালালে এখান থেকে প্রাক-মুসলিম আমলের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস উন্মোচিত হতে পারে।
• রামগোপাল মন্দির: এটি বল্লাল সেন বা তাঁর পরবর্তী সেন রাজাদের আমলে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক মন্দির। এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী এবং সংলগ্ন প্রাচীন দিঘি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন।
• বিজুলিয়া ও শেখপাড়ার নীলকুঠি: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলকর সাহেবরা শৈলকুপার উর্বর জমিতে নীল চাষের জন্য বেশ কিছু কুঠি স্থাপন করে। এর মধ্যে বিজুলিয়া ও শেখপাড়ার নীলকুঠি ছিল অন্যতম অত্যাচারী কেন্দ্র। বর্তমানে এই কুঠিগুলোর ধ্বংসাবশেষ অত্যাচারী ব্রিটিশদের শোষণ এবং তার বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের স্মৃতি বহন করছে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ
শৈলকুপার মানুষ চিরকালই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন। ১৮৫৯-১৮৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহে শৈলকুপার কৃষকেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৮৮৯ সালে এখানকার ৪৮টি গ্রামের কৃষক একতাবদ্ধ হয়ে নীলকরদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং কুঠিগুলো ঘেরাও করে। পরবর্তীতে ১৯২০-এর দশকে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও শৈলকুপার যুবসমাজ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার পর শৈলকুপা অঞ্চলের ছাত্র, জনতা ও আনসার সদস্যরা দ্রুত সংগঠিত হতে শুরু করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মসিউর রহমানের নেতৃত্বে এখানে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে ওঠে।
• গাড়াগঞ্জ যুদ্ধ (৫ এপ্রিল ১৯৭১): এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম সফল সম্মুখ যুদ্ধ। ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের গাড়াগঞ্জ ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা অ্যামবুশ পেতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বড় কনভয়ের ওপর হামলা চালায়। এই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয় এবং তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
• আবাইপুর যুদ্ধ (১৩ অক্টোবর ১৯৭১): আবাইপুর ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর-রাজাকারদের এক তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন এবং শত্রুপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
• কামান্না ট্র্যাজেডি (২৬ নভেম্বর ১৯৭১): শৈলকুপার ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও রক্তঝরা অধ্যায় হলো কামান্না ট্র্যাজেডি। কামান্না গ্রামের একটি বাড়িতে দিবাগত রাতে একদল মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা গভীর রাতে ঘুমন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং ব্রাশফায়ার করে। এতে ২৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এই বীর শহীদদের গণকবর আজও কামান্না গ্রামে সংরক্ষিত রয়েছে, যা প্রতি বছর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।
• শৈলকুপা মুক্ত দিবস: অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৩ই ডিসেম্বর শৈলকুপা উপজেলা পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলিত হয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র
শৈলকুপার রাজনৈতিক অঙ্গন বরাবরই অত্যন্ত সচেতন এবং প্রভাবশালী। ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার মানুষের মধ্যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল। দেশভাগের পর বামপন্থী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধিকার আন্দোলনে শৈলকুপা ছিল ঝিনাইদহ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
সামাজিক কাঠামো ও সম্প্রীতি: শৈলকুপার সমাজ ব্যবস্থা মূলত মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের এক চমৎকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখানকার সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংহত এবং গ্রামীণ পঞ্চায়েত বা ‘মাতব্বর’ প্রথার ইতিবাচক প্রভাব এখনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখে। শিক্ষার প্রসারের ফলে রক্ষণশীলতা কাটিয়ে এখানকার সমাজ ব্যবস্থা এখন অনেক আধুনিক ও প্রগতিশীল। তবে গ্রামীণ রাজনীতিতে পারিবারিক আধিপত্য এবং গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব বা ‘দলবাজি’ কোনো কোনো সময় এখানকার সামাজিক শান্তিতে বিঘ্ন ঘটায়, যা দূর করতে তরুণ প্রজন্ম এখন সচেতন ভূমিকা রাখছে।
শৈলকুপার গৌরবোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব
শৈলকুপার মাটি বহু বিখ্যাত সুফি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক এবং শিক্ষাবিদের জন্ম দিয়েছে, যাঁরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রেখেছেন।
• গোলাম মোস্তফা (কবি): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি এবং অনুবাদক গোলাম মোস্তফা ১৮৯৭ সালে শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রচিত ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। এছাড়া তাঁর বহু কবিতা ও গান আজও বাঙালি হৃদয়ে দোলা দেয়।
• খন্দকার আনোয়ারুল হক: তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং সমাজসেবক, যিনি এই অঞ্চলে নারী শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার প্রসারে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।
• মসিউর রহমান (বীর প্রতীক): মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী এবং শৈলকুপা অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, যাঁর অসীম সাহসিকতা এই অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করতে ভূমিকা রেখেছিল।
• শহীদ কামরুজ্জামান ও বীর শহীদগণ: কামান্না ট্র্যাজেডিসহ বিভিন্ন যুদ্ধে শহীদ হওয়া বীর সন্তানেরা শৈলকুপার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, যাঁদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ।
কৃষি ব্যবস্থা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
শৈলকুপার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো এর অত্যন্ত উর্বর এবং বৈচিত্র্যময় কৃষি ব্যবস্থা। কুমার নদ, গড়াই এবং কালী নদীর অববাহিকায় পলি জমে জমে এখানকার মাটি সোনাফলা হয়ে উঠেছে।
- পেঁয়াজের রাজধানী: শৈলকুপাকে বলা হয় ঝিনাইদহ তথা সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ‘পেঁয়াজের ভাণ্ডার’। এখানকার উৎপাদিত দেশি পেঁয়াজ আকারে ছোট হলেও এর ঝাঁজ, সুগন্ধ এবং স্থায়িত্বের কারণে সারা দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি বছর উপজেলার আবাইপুর, মনোহরপুর, বগুড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত মানের পেঁয়াজ ও রসুন চাষ হয়। এখানকার শৈলকুপা হাটে মৌসুমে কোটি কোটি টাকার পেঁয়াজ কেনাবেচা হয়।
- সোনালী আঁশ পাট: এক সময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের গৌরব শৈলকুপা আজও ধরে রেখেছে। এখানকার কৃষকেরা ব্যাপকভাবে দেশি ও তোষা পাটের চাষ করেন। পাট পচানোর জন্য কুমার নদের পানি ব্যবহার করা হয় এবং উৎপাদিত পাট দেশীয় জুট মিলগুলোতে সরবরাহ করা হয়।
- মিষ্টি পান চাষ: শৈলকুপার বেশ কিছু অঞ্চলে বিশেষ করে উর্বর ও উঁচু জমিতে ঐতিহ্যবাহী ‘পান বরজ’ দেখা যায়। এখানকার মিষ্টি পান অত্যন্ত সুস্বাদু এবং এটি দেশের বিভিন্ন জেলা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হয়ে থাকে।
- ধান ও বিবিধ ফসল: প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে আউশ, আমন ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয় এখানে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভুট্টা, সরিষা, তিল এবং সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। শীতকালে শৈলকুপার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, ও লাউয়ের মতো বিষমুক্ত সবজির সমারোহ ঘটে।
ব্যবসা, বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতি
কৃষিনির্ভর হলেও শৈলকুপায় ব্যবসা-বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। জলপথ হিসেবে কুমার নদ এক সময় এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান রুট ছিল। ঢাকা, খুলনা ও কলকাতার বড় বড় মহাজনেরা এক সময় নৌকা ও লঞ্চে করে শৈলকুপায় আসতেন পাট, নীল ও মসলা কিনতে।
• ঐতিহ্যবাহী হাট-বাজার: শৈলকুপা উপজেলা সদর হাট এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এছাড়া ত্রিবেণী হাট, ফুলহরি হাট, গাড়াগঞ্জ বাজার, ডিগনগর হাট এবং কাঁচেরকোল হাট স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এই হাটগুলোতে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে কোটি কোটি টাকার কৃষি পণ্য, গবাদি পশু এবং কুটির শিল্পের জিনিসপত্র কেনাবেচা হয়।
• ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প: শৈলকুপার মৃৎশিল্প (মাটির হাঁড়ি-পাতিল, সানকি তৈরি), বাঁশ ও বেতের তৈরি কুটির শিল্প এবং তাঁত শিল্প এক সময় খুবই বিখ্যাত ছিল। যুগের পরিবর্তনে প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসনে এই শিল্পগুলো কিছুটা সংকটে পড়লেও এখনও বহু পরিবার এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে।
• অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স ও সেবা খাত: বর্তমানে শৈলকুপার অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান অনেক। প্রবাসী আয়ের কারণে উপজেলার গ্রামীণ আবাসন ও জীবনযাত্রার মান দ্রুত উন্নত হচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME) এবং রড-সিমেন্ট-টিন ও কাপড়ের ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও বিনোদন
শৈলকুপার সংস্কৃতি অত্যন্ত মেলবন্ধনপূর্ণ এবং লোকজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। পাশ্ববর্তী কুষ্টিয়ার বাউল সম্রাট লালন শাহ এবং ঝিনাইদহের মরমী কবি পাগলা কানাইয়ের আধ্যাত্মিক দর্শনের এক গভীর প্রভাব রয়েছে শৈলকুপার সাধারণ মানুষের মননে।
• লোকসঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক উৎসব: গ্রামীণ মেলা, নবান্ন উৎসব এবং বৈশাখী মেলায় আজও শৈলকুপায় জারি গান, শারি গান, কবিগান ও বাউল গানের আসর বসে। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা ও চড়ক পূজার সময় এবং মুসলিমদের ঈদ উৎসবে লোকসংস্কৃতির এক মিলনমেলা ঘটে।
• কুমার নদের নৌকা বাইচ: বর্ষাকালে যখন কুমার নদ পানিতে টইটুম্বুর থাকে, তখন শৈলকুপার বিভিন্ন পয়েন্টে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর কাশির শব্দে, হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে এই উৎসব রূপ নেয় এক মহা-আনেন্দ।
• গ্রামীণ ক্রীড়া ঐতিহ্য: এক সময়কার বিখ্যাত হা-ডু-ডু, লাঠি খেলা এবং দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনও প্রতি বছর বিভিন্ন ইউনিয়নে বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আধুনিকায়নের যুগে শৈলকুপা আজ শতভাগ বিদ্যুৎ, উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল সেবা সুবিধার আওতায় এসেছে। তবে এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে:
১. কুমার নদের নব্যতা সংকট: এক সময়ের প্রমত্তা কুমার নদ আজ পলি পড়ে এবং অবৈধ দখলের কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। নদীটি পুনঃখ খনন করা হলে কৃষি সেচ ও মৎস্য চাষে এক নতুন বিপ্লব ঘটবে।
২. হিমাগার (Cold Storage) অভাব: শৈলকুপায় বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ ও সবজি উৎপাদিত হলেও পর্যাপ্ত সরকারি হিমাগার না থাকায় কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। একটি বিশেষায়িত পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার স্থাপন এখানকার কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি।
৩. পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা: সুলতানি আমলের শাহী মসজিদ, হরিহরার গড় এবং কামান্নার শহীদ মঠকে কেন্দ্র করে সরকারি উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা সম্ভব, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করবে।
ইতিহাসের গৌরব, প্রকৃতির অকৃপণ দান আর মেহনতি মানুষের শ্রমে গড়া এক অনন্য জনপদ শৈলকুপা। এর মাটির প্রতিটি কণা বহন করছে অতীতের শৌর্য-বীর্যের কথা, আর এর দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ জানান দেয় এক সমৃদ্ধ আগামীর সম্ভাবনা। সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে শৈলকুপা আগামী দিনে বাংলাদেশের এক আদর্শ ও সমৃদ্ধ মডেল উপজেলা হিসেবে দেশ দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে—এটাই এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা (ঝিনাইদহ জেলা), বাংলাপিডিয়া, এবং জেলা তথ্য বাতায়ন।