ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঝটিকা সফর, ঝিনাইদহের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় নতুন আশার আলোর সঞ্চার হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক কঠোরতার এক নতুন বার্তা নিয়ে ঝিনাইদহের স্বাস্থ্য খাত ঘুরে দেখলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। জেলাটির মহেশপুর, কোটচাঁদপুর ও কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক এই পরিদর্শনে যেমন উন্মোচিত হয়েছে তৃণমূলের চিকিৎসা খাতের নানা অনিয়ম, তেমনি ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পেয়েছে বহু কাঙ্ক্ষিত সমাধানের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস।
রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঝিনাইদহের এই তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এক নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে যায়। পরিদর্শনের শুরুতেই মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর এবং দুপুরে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছান মন্ত্রী। পরিদর্শনের সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে নেওয়া নানা প্রতিশ্রুতির তথ্য।

পরিদর্শনে যা দেখা মিলল হঠাৎ করেই হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরাসরি বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রবেশ করেন এবং চিকিৎসাধীন রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সাথে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান, ওষুধ সরবরাহ ও খাবারের বিষয়ে কথা বলেন। কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিজে তদারকি করার পাশাপাশি হাসপাতালের বাথরুম, পরিবেশ ও খাবারের মান যাচাই করতে মন্ত্রী নিজে খাবার খেয়ে পরীক্ষা করেন।
পরিদর্শনকালে উঠে আসে জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের করুণ চিত্র। মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নেলেনা আক্তার নিপা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর তীব্র সংকটের কথা অবহিত করেন। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত কর্মীদের বেতন বকেয়া থাকা এবং এক ঠিকাদারের মাধ্যমে কর্মীদের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে ভৈরবা হাসপাতাল বন্ধ থাকা এবং মাঠপর্যায়ে ওষুধ বিতরণে জটিলতার বিষয়গুলোও নজর কাড়ে তাঁর।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো যা আশ্বাস পেল তৃণমূলের এই সমস্যাগুলো শোনার পরপরই তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী নানা পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী:
তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কঠোরতা: আউটসোর্সিং কর্মীদের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করার কথা জানান মন্ত্রী। ঘুষ দাবির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মনিরুলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কর্মীদের স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দেন—কেউ যেন এক টাকাও ঘুষ না দেয়। চিকিৎসক সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে পরিদর্শনের সময় থেকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে টেলিফোনে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করেন তিনি। এছাড়া সারাদেশে দ্রুত ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান মন্ত্রী।
১৫১ শয্যা ও ৯ তলা আধুনিক ভবন: ঝিনাইদহসহ দেশের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে আগামী তিন বছরের মধ্যে ৯ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবনে রূপান্তর করে ১৫১ শয্যাভিত্তিক হাসপাতালে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।
বিশেষায়িত সেবার সংযোজন: সম্প্রসারিত ১৫১ শয্যার হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের জন্য ২৫ শয্যা এবং শিশুদের জন্য ২০ শয্যার পৃথক বিশেষায়িত ওয়ার্ড থাকবে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়েই জটিল রোগীদের চিকিৎসায় ৫টি করে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনের সুবিধাসহ উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।
দেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: সারাদেশে ২ থেকে আড়াই হাজার শয্যার ১০ থেকে ১২টি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী, যার মধ্যে দুটি হাসপাতাল নির্দিষ্ট থাকবে নারীদের সেবায়। পাশাপাশি ভৈরবা হাসপাতালের মতো বন্ধ কেন্দ্র সচলসহ দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে হেলথ সেন্টার চালুর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করা হয়।
বিগত সময়ের দুর্নীতি ও অনিয়মের শৃঙ্খলা ভেঙে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার এ বার্তা ঝিনাইদহবাসীকে চিকিৎসাসেবার নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পরিদর্শনকালে উপজেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাবৃন্দ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।