দিল্লির ঐতিহাসিক

দিল্লিতে ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে বসবাস, উচ্ছেদ ৭১৭ পরিবার; পুনর্বাসন ৩১ মাইল দূরে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

ভারতের রাজধানী দিল্লির অভিজাত রেসকোর্স এলাকায় শতাব্দীপ্রাচীন একটি মসজিদ ঘিরে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছিলেন শত শত মুসলিম পরিবার। কিন্তু সরকারি উচ্ছেদ অভিযানে তাঁদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও জীবিকার অবলম্বন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এসব পরিবারের ঠিকানা আগের বসতি থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরের একটি পুনর্বাসন এলাকায়।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৭ অক্টোবর দিল্লির রেসকোর্স এলাকায় এই উচ্ছেদ অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ। এতে ৭১৭টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। সরকারি জমিতে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলা এবং সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

উচ্ছেদের পর এলাকাটিতে শুধু ঐতিহাসিক মসজিদ ও কাছাকাছি একটি মন্দির অক্ষত রয়েছে। তবে মসজিদটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। মুসল্লিদের প্রবেশ ও নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

মসজিদসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের ৫০ বছর বয়সী এক গাড়িচালক বলেন, ওই জায়গাতেই তাঁর বাবার বিয়ে হয়েছিল। কয়েক দশক পর তাঁর মেয়ের বিয়েও হয়েছে সেখানে। শৈশব থেকে পুরো জীবন কেটেছে মসজিদটিকে ঘিরে। উচ্ছেদের পর সেই পরিচিত জনপদ ছেড়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।

আদালতের অনুমতিতে উচ্ছেদ

স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে নিলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে।

তবে নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত আগস্টে আদালত উচ্ছেদের অনুমতি দেন। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরিবারগুলোকে দিল্লির উপকণ্ঠে সাভদা ঘেবরা এলাকায় পুনর্বাসন করা হয়েছে। তবে নতুন আবাসন নিয়ে সন্তুষ্ট নন অনেকেই। তাঁদের অভিযোগ, সেখানে স্থানান্তরের ফলে কর্মসংস্থান, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

মসজিদটির মালিকানা নিয়েও রয়েছে বিরোধ। ভারত সরকারের দাবি, এটি সরকারি জমিতে নির্মিত। অন্যদিকে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৭৭ সালে স্থাপনাটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের তথ্যমতে, মসজিদটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। যদিও অন্যদের মতে, এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে।

উচ্ছেদের পর মসজিদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালুর দাবিতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ওয়াক্‌ফ বোর্ড। পাশাপাশি মসজিদে নামাজ আদায়ের ওপর বিধিনিষেধ এবং ভবিষ্যতে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন একজন মুসল্লি। আগামী ১৬ ডিসেম্বর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

জীবিকা হারিয়ে বিপাকে পরিবারগুলো

উচ্ছেদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। রেসকোর্স এলাকার অভিজাত বাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব পরিবারের সদস্যরা গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি ও গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। বসতি থেকে দূরে চলে যাওয়ায় অনেকেই পুরোনো কর্মস্থল হারিয়েছেন।

রেখা নামের এক বিধবা নারী আগে পাশের বাড়িতে ধোয়ামোছার কাজ করতেন। পাশাপাশি একটি মন্দিরে সেবায়েতের দায়িত্ব পালন করতেন। উচ্ছেদের পর তাঁর পুরোনো কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁকে তিনতলার একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে দেওয়া হয়েছে। পায়ে অস্ত্রোপচারের পর লোহার পাত থাকায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামাও তাঁর জন্য কষ্টকর।

রেখা বলেন, তাঁকে একটি বাসা দেওয়া হলেও তাঁর নিজের বাড়িটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের গোছানো সংসার ছেড়ে নতুন জায়গায় আবার জীবন শুরু করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

নগর গবেষক মুক্তা নায়েক বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের উচ্ছেদের কারণে মানুষ কর্মস্থল ও পরিচিত সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে তাদের জীবিকা নষ্ট হয় এবং আয় কমে যায়। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্কও নতুন জায়গায় গিয়ে ভেঙে পড়ে।

সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তা

পুনর্বাসন এলাকায় স্থানান্তরের পর সন্তানদের শিক্ষাজীবন নিয়েও বিপাকে পড়েছেন অনেক অভিভাবক। বাবলু নামের এক ব্যক্তি জানান, তাঁর সন্তান এখনো দিল্লির মধ্যাঞ্চলের আগের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে মেট্রোতে তিনবার ট্রেন পরিবর্তন করে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে হয়। আবার বিদ্যালয় ছুটির পর একইভাবে ফিরতে হয়।

আগে রেসকোর্সের একটি ক্লাবে কাজ করতেন বাবলু। উচ্ছেদের পর সেই কাজও হারিয়েছেন। এখন অন্য এলাকায় নতুন কাজ খুঁজছেন।

৬৩ বছর বয়সী নাঈম খানের পরিবারও পড়েছে সংকটে। তাঁর দুই নাতি কথা বলতে ও শুনতে পারে না। তাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু নতুন পুনর্বাসন এলাকায় এ ধরনের সুবিধা পর্যাপ্ত নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের সবাই একসঙ্গে থাকতে না পারায় তাঁদের আলাদা জায়গায় বসবাস করতে হচ্ছে।

নগর গবেষকদের মতে, এই বাস্তুচ্যুতির সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে নারীদের ওপর। শিশুদের দেখাশোনা, যাতায়াতের বাড়তি খরচ ও নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে তাঁদের পক্ষে দূরে গিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে আখতারি নামের এক বিধবা নারী আগে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে প্রতিদিন প্রায় ১০০ রুপি আয় করতেন। নতুন এলাকায় চলে আসার পর সেই আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে এ ধরনের উচ্ছেদ নতুন নয়। কাজের সন্ধানে শহরে আসা নিম্ন আয়ের মানুষদের দীর্ঘদিনের বসতি থেকে সরিয়ে শহরের দূরবর্তী এলাকায় পুনর্বাসনের ঘটনা ঘটছে। জমির বৈধ মালিকানার কাগজপত্র না থাকায় কয়েক দশক ধরে বসবাস করেও অনেক পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়ছে।

সাভদা ঘেবরা এলাকায় ২০০৬ সালে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়। শুরুতে সেখানে সড়ক, পানি ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। পরে বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট গড়ে তোলেন।

এখন রেসকোর্স থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোকেও সেখানে নতুন করে জীবন শুরু করতে হচ্ছে। তবে তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হারানো কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশের কতটুকু আর ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।

সূত্র: বিবিসি।

এলাকা সম্পর্কে: ঝিনাইদহ জেলা (উইকিপিডিয়া)

আরো পড়ুন
মিশিগানে ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা
কেনিয়া যুক্তরাষ্ট্র
4994
আরো পড়ুন
IMG_20251214_140501
আরো পড়ুন
সবচেয়ে বেশি হীরা উত্তোলন করা দেশগুলো
আরো পড়ুন
Scroll to Top