কেনিয়া যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন প্রভাবিত করছেন ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শকেরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে গোপন প্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত অপপ্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে ভারতের একদল রাজনৈতিক পরামর্শকের বিরুদ্ধে। কেনিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপ—বিভিন্ন দেশের নির্বাচনী প্রচারে পরিচয় গোপন রেখে কাজ করছেন এসব পরামর্শক ও তাঁদের নিয়োগ করা অনলাইন কর্মীরা। অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে জনমত তৈরির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের সুনাম ক্ষুণ্ন করতেও ব্যবহার করা হচ্ছে নানা অপকৌশল।

আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আন্তর্জাতিক নির্বাচনী প্রচারের একটি বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া অ্যাকাউন্ট, বট, সম্পাদিত ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর পোস্টের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ভোটারদের মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

প্রতিবেদনে ভারতের আহমেদাবাদের ২২ বছর বয়সী ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা রাজন কুমারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর পক্ষে প্রচারসামগ্রী তৈরি করেছিলেন। পরিচয় গোপন রেখে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে এসব পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হতো। প্রতিদিন প্রায় ৫০টি পোস্ট তৈরির বিনিময়ে তিনি পেতেন সাত ডলার।

রাজন কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার, মিথ্যা দাবি সংবলিত পোস্টার তৈরি এবং নারী রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপপ্রচারের মতো কাজও করতে হতো তাঁদের। এসব প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিপক্ষকে বিতর্কিত করা এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বেশি বলে মানুষের সামনে তুলে ধরা।

২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন উইলিয়াম রুটো। তবে দেশটির নির্বাচনী প্রচারে ভারতীয় পরামর্শকদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটদের দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনেও একই ধরনের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের দাবি, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেন্সের পক্ষে পরিচয় গোপন রাখা ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিও প্রচার করা হয়েছিল। অন্তত ২৮টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে অনলাইন অপপ্রচার নিয়ে কাজ করা গবেষকদের একটি দল। এসব ভিডিও এক্সে ৭০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। পরে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ভোটে স্টিভেন্স আবদুল আল-সাইদের কাছে পরাজিত হন।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এখন একটি সংগঠিত ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পুরোনো পেজ কিনে নেওয়া, ভাড়া করা কিংবা নতুন পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে গোপন প্রচার চালায়। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।

ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরি প্রতিবেদনে স্বীকার করেছেন, নির্বাচনী প্রচারে কারসাজি করা হয়। তাঁর দাবি, ভারতের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিদেশের রাজনৈতিক প্রচারশিবিরগুলোও তাঁদের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি এবং দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশেও ভারতীয় পরামর্শকদের কাজের তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব প্রচারের অর্থায়ন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন পরামর্শকের ভাষ্য, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের নামে অর্থ লেনদেন করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে হাওয়ালা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ফলে এসব প্রচারের অর্থের উৎস ও প্রকৃত পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে কেনিয়ায় কর্মরত দুই ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শক জুলফিকার আহমদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াইয়ের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নাইরোবিতে নিখোঁজ হওয়ার পর অক্টোবরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের অপহরণের সঙ্গে কেনিয়ার পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। পরে এ ঘটনায় ১৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ২০২৬ সালের আগস্টে দেশটির হাইকোর্ট তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাতিল করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার নির্বাচনী প্রচারকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি গোপন অপপ্রচার ও ভোটারদের প্রভাবিত করার ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের নির্বাচনী প্রচারে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত গোপন প্রচার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে।

রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিস্তারকে বৈশ্বিক আউটসোর্সিং শিল্পের নতুন রূপ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, ভৌগোলিক দূরত্ব ও পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রচারশিবিরগুলো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যেতে পারে। ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অর্থে কারা প্রভাব বিস্তার করছে, তা শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

সূত্র: আল-জাজিরা, ৪ নভেম্বর ২০২৬।

আরও পড়ুন:

আরো পড়ুন
4994
আরো পড়ুন
IMG_20251214_140501
আরো পড়ুন
সবচেয়ে বেশি হীরা উত্তোলন করা দেশগুলো
আরো পড়ুন
ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক
আরো পড়ুন
জম্মু-কাশ্মীরের কুলগামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২ ভারতীয় সেনা নিহত
আরো পড়ুন
ইরান বিভিন্ন ক্ষেত্রে গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি জিম্মি সংকট, ১৯৮০ সালের অপারেশন ঈগল ক্ল, এবং ইসরায়েলের পারমাণবিক নথি তেহরানে চলে যাওয়া - এই ঘটনাগুলো ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দুর্বলতা এবং ব্যর্থতার উদাহরণ। এই সব ঘটনায় ইরান বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে. ইরানের গোয়েন্দা ব্যর্থতার উদাহরণ: **ইরান জিম্মি সংকট (Iran Hostage Crisis): ১৯৭৯ সালে তেহরানে ৬৬ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করে রাখা হয় এবং তাদের মধ্যে ৫২ জনকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জিম্মি করে রাখা হয়। এই সংকট ইরানি বিপ্লবের পর দেখা দেয়। এই সংকট ছিল একটি আন্তর্জাতিক সংকট, যেখানে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের দুর্বলতা এবং ব্যর্থতা প্রমাণ করে. **অপারেশন ঈগল ক্ল (Operation Eagle Claw): ১৯৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জিম্মিদের উদ্ধারের জন্য একটি অভিযান চালায়, যা অপারেশন ঈগল ক্ল নামে পরিচিত। এই অপারেশনে দুটি হেলিকপ্টার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এগিয়ে যেতে পারেনি এবং একটি ধূলিঝড়ের কারণে দৃশ্যমানতা হ্রাস পায়। এই কারণে পুরো দলটিকে দেরিতে অবতরণ করতে হয় এবং অভিযানটি ব্যর্থ হয়. **ইসরায়েলের পারমাণবিক নথি তেহরানে চলে যাওয়া: সম্প্রতি ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনার নথি তেহরানে চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনা ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার আরও একটি উদাহরণ, যেখানে তাদের দুর্বলতার কারণে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে. **ইসরাইলের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি: কিছু তথ্য থেকে জানা গেছে যে, ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই তথ্য ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দুর্বলতা এবং ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়. এই সব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের কাজ সঠিকভাবে করতে পারেনি এবং তাদের দুর্বলতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়েছে। এই দুর্বলতার কারণে ইরান বিভিন্ন ক্ষেত্রে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে.
আরো পড়ুন
Scroll to Top