ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক

ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কে তেল চুরি ও পানি মেশানোর রমরমা বাণিজ্য, বাড়ছে যানবাহনে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি

বিশেষ প্রতিবেদক (যশোর ও ঝিনাইদহ)

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যস্ততম ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক এখন চোরাই জ্বালানি তেল কারবারিদের প্রধান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। খুলনা ও কুষ্টিয়ার প্রধান তেল ডিপো থেকে ছেড়ে আসা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কোম্পানির ট্যাংকলরি, কাভার্ডভ্যান ও অফিশিয়াল যানবাহন থেকে প্রতিদিন প্রকাশ্যে নামানো হচ্ছে হাজার হাজার লিটার ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন। চালকদের যোগসাজশে সড়কজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ আস্তানায় অবাধে চলছে এই চোরাই বাণিজ্য। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, চুরি করা তেলের ঘাটতি মেকাতে ট্যাংকলরিতে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও পানি, যা পরবর্তীতে মূল পাম্পে সরবরাহ করায় চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ যানবাহন মালিকরা। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন কিংবা ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই মহাসড়কের পাশে পরিচালিত এই বিপজ্জনক কারবার বন্ধে প্রশাসনের চরম নির্লিপ্ততা এবং মাসোহারা সিন্ডিকেটের প্রতাপ নিয়ে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের যশোর অংশের হৈবতপুর ইউনিয়নের বারীনগর (সাতমাইল) এলাকাকে কেন্দ্র করে এই অপরাধ চক্রের মূল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। সড়কের পাশের কৌশলগত একাধিক পয়েন্টকে নিরাপদ জোন হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাই চক্রটি। এর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় স্পটগুলো হলো:

  • বারীনগর (সাতমাইল) বাজার এলাকাতেই মহাসড়কের দুই পাশে অন্তত ৮টি অবৈধ তেলের দোকান ও গোপন আস্তানা রয়েছে, যেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যে তেল নামানো হয়।
  • সানতলা পেপসি মিল সংলগ্ন এলাকায় পণ্যবাহী দূরপাল্লার যানবাহন ও লরি থামানোর অন্যতম প্রধান আস্তানা।
  • চুড়ামনকাটী বাজার ও সংলগ্ন সড়কে ছোট-বড় পিকআপ ও কাভার্ডভ্যান থেকে ছোট ড্রামে তেল সংগ্রহের কেন্দ্র।
  • বারোবাজার সংযোগ সড়কে নির্জন ও কম নজরদারির সুযোগ নিয়ে এখানে রাতের আঁধারে বড় আকারের ট্যাংকলরি থেকে তেল কেনাবেচা চলে।

খুলনার নদীভিত্তিক তেল ডিপো (বাঘাবাড়ী/পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ডিপো) বা কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রধান জোগান কেন্দ্রগুলো থেকে যখন যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও আশপাশের জেলার পেট্রোল পাম্প এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে জ্বালানিবাহী ট্যাংকলরি বা ভাউচারগুলো রওনা হয়, তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সিন্ডিকেট।

লরি চালকদের সাথে আগাম চুক্তিতে সিন্ডিকেটের সদস্যরা লরির অসাধু চালক ও সহযোগীদের (হেলপার) সাথে আগেই যোগাযোগ রক্ষা করে। বারীনগর বা সানতলা এলাকায় পৌঁছামাত্র নির্ধারিত গলিতে লরি থামিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে গ্যালে বা জারিকেন ভরে ১০০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল নামিয়ে নেওয়া হয়।

হিসাব মেলাতে পানি ও কেমিক্যাল সংমিশ্রণ
ডিপো থেকে পাম্পে পৌঁছানোর পর পরিমাপে যেন চুরি ধরা না পড়ে, সে জন্য চক্রটি চতুরতার আশ্রয় নেয়। লরি থেকে যে পরিমাণ ডিজেল বা পেট্রোল বের করা হয়, ঠিক সমপরিমাণ পানি বা বিষাক্ত তরল কেমিক্যাল পাইপ দিয়ে ট্যাংকলরির ভেতরের খোপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

যানবাহনের মারাত্মক ক্ষতি: এই ভেজাল ও পানিমিশ্রিত তেল পাম্পগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মোটর চালক, ট্রাক ও বাস মালিকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত সড়কে বিকল হচ্ছে যানবাহন, নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান ইঞ্জিন এবং জ্বালানি পাম্পগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কম দামে বেচাকেনা: সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে চোরাই কারবারিরা চালকদের কাছ থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ও পেট্রোল মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে কিনে নেয়। পরবর্তীতে তা স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ী ও অবৈধ খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অবৈধ অর্থ উপার্জন করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা ও ‘মাসোহারা’র অভিযোগ
বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪ এবং ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো দাহ্য পদার্থ মজুত, পরিবহন ও বিক্রির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা থাকতে হয়। কিন্তু মহাসড়কের পাশের এই অর্ধশতাধিক অবৈধ দোকানে কোনো ধরনের আইনি কাগজপত্রের অস্তিত্ব নেই।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং মহাসড়ক টহল দলের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্যকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের ‘মাসোহারা’ বা মাসোহারার টাকা দিয়ে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাতমাইল এলাকার এক তেল ব্যবসায়ী জানান, “আমাদের কোনো কাগজপত্র নেই, ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ। তবে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাইকে ম্যানেজ করেই এই কাজ করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতি মাসে এসে টাকা নিয়ে যান, তাই কোনো ঝামেলা হয় না।”

এমনকি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাদের ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না বলে দম্ভোক্তি করে চক্রটির সদস্যরা।

ক্যামেরাবন্দি ভিডিও ও সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া আলোড়ন
এই চোরাই সিন্ডিকেটের ভয়াবহতার প্রমাণ মেলে সম্প্রতি চিত্রায়িত এক ঘটনার মাধ্যমে। বিগত মার্চ ২০২৬-এ, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সাতমাইল এলাকায় দিনে-দুপুরে একটি চলন্ত ট্যাংকলরি থামিয়ে ড্রামে করে প্রকাশ্যে তেল নামানোর লাইভ দৃশ্য এক স্থানীয় সাংবাদিকের মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি হয়।

পরবর্তীতে উক্ত ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে (ভাইরাল) জেলাজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মহাসড়কের ওপর লরি দাঁড় করিয়ে পাইপ ও ক্যান নিয়ে খুব দ্রুততম সময়ে তেল বের করে নেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের তীব্র দাবির মুখে সাময়িকভাবে কয়েকদিন চোর চক্রের অপ তৎপরতা বন্ধ থাকলেও, প্রশাসনিক নজরদারি ঝিমিয়ে পড়তেই পুনরায় তারা একই কায়দায় পুরোদমে ব্যবসা শুরু করেছে।

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা
উন্মুক্ত অবস্থায় ড্রাম, বালতি ও প্লাস্টিকের ক্যানভর্তি দাহ্য পদার্থ মহাসড়কের পাশে ফেলে রাখার কারণে যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বারীনগর ও সানতলার মতো জনবহুল বাজারে এই অবৈধ দোকানগুলোর আশপাশে খোলা শিখা বা সিগারেটের আগুন থেকে বড় ধরণের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

তাছাড়া, চলন্ত ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যানগুলো হঠাৎ করে মহাসড়কের ওপর অলস দাঁড়িয়ে পড়ে তেল নামানোর কারণে পেছনের দ্রুতগতির যানবাহনের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এতে দূরপাল্লার বাস ও মোটরসাইকেল চালকরা প্রায়ই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

সার্বিক বিষয়ে সাজিয়ালি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জানান, “সাতমাইল ও আশপাশের এলাকায় চোরাই তেলের কারবার রোধে ইতিপূর্বেও অভিযান চালানো হয়েছে। সম্প্রতি বিষয়টি নতুন করে নজরে এসেছে। মহাসড়কে বেআইনি কর্মকাণ্ড ও দাহ্য পদার্থের অবৈধ বাণিজ্য বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুতই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জাতীয় সম্পদের এই বিপুল অপচয়, ভেজাল তেলের কারণে যানবাহনের ক্ষতিসাধন এবং সম্ভাব্য ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড রোধে অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানের জোর দাবি জানিয়েছেন সাধারণ চালক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। অবিলম্বে বারীনগরসহ মহাসড়কের চিহ্নিত আস্তানাগুলো উচ্ছেদ না করা হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

আরো পড়ুন
জামায়াতের উসকানিতেই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ মিছিল করছে: রাশেদ খাঁন
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে আত্মহত্যায় ১০ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজারের বেশি, চলতি ৬ মাসেই ১৮৯ জন
আরো পড়ুন
শৈলকুপায় বাস ও ইঞ্জিন চালিত গাড়ি
আরো পড়ুন
কোটচাঁদপুরে মাদ্রাসা শিক্ষকের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে সার জব্দ
আরো পড়ুন
Scroll to Top