কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) উপজেলা প্রতিনিধি
কার্তিকের শুরুতেই প্রকৃতিতে শীতের আবাহন। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন চারপাশ আর গোধূলিলগ্নের হিমেল হাওয়া জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। এই শীতকে ঘিরে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জসহ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ। গ্রামীণ জনপদে এখন গাছিদের দা, ছেনি আর রশি হাতে গাছে ওঠার চিরচেনা ও উৎসবমুখর দৃশ্য চোখে পড়ছে। সময়ের চাহিদা মেনে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পেশাদার গাছিরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন খেজুর গাছ পরিচর্যা, ছাঁটাই ও চেঁছে হাঁড়ি বসানোর প্রস্তুতিতে।
কালীগঞ্জের মাঠঘাট ও রাস্তার পাশের গাছে গাছে এখন নতুন রূপ। গাছিরা কোমরে মোটা রশি বেঁধে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে পড়ছেন গাছের উপরিভাগে। দা দিয়ে ডালপালা ছেঁটে পরিষ্কার করার পর ছেনি দিয়ে গাছের সাদা বুক বের করে নিচ্ছেন তারা। সেই চেঁছা অংশ শুকিয়ে রস ঝরার উপযুক্ত পথ তৈরি করাই এখন তাদের মূল কাজ। এটি এক জটিল ও শিল্পসুষম কৌশল, যা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে।
স্থানীয় প্রবীণ অধিবাসীরা জানান, আশ্বিন মাসের শেষের দিক থেকেই শুরু হয় রস সংগ্রহের প্রাথমিক তোড়জোড়। অগ্রহায়ণের শুরু থেকে পুরোদমে রস ঝরা শুরু হয়, যা পৌষ ও মাঘের তীব্র শীত পার করে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে।
গাছিদের আগাম প্রস্তুতি ও স্থানীয় আমেজ নিয়ে কথা হয় এলাকার অধিবাসী মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “শীতের সকাল মানেই তো টাটকা খেজুর রসের সুবাস। ভোরে হাঁড়ি নামিয়ে আনা আর তার থেকে মিষ্টি রসের ধারা পানের যে আনন্দ, তা শহরের কৃত্রিমতায় মেলা ভার। খেজুরের রস ও ঝোলা গুড় কেবল মুখরোচক খাবার নয়; এটি ঝিনাইদহ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি, প্রাচীন ঐতিহ্য ও স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শীতের সকালে মা-বোনেদের ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা কিংবা রস-মুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে গ্রামে গ্রামে।”
কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে কালীগঞ্জে রস সংগ্রহ করতে এসেছেন গাছি রেজাউল ইসলাম। নিজের কাজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “মৌসুমের শুরুতেই সঠিক নিয়মে গাছ ছাঁটাই ও চাঁচ দেওয়া না হলে রস ঠিকমতো ঝরে না। রসের ঘনত্ব ও স্বাদ নির্ভর করে গাছের সঠিক দেখভাল এবং গাছির দক্ষতার ওপর। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে; উপর থেকে পড়ে গিয়ে বড় ধরণের আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবুও জীবিকার তাগিদে এবং বংশানুক্রমিক এ কাজের টানে আমরা রাত-দিন খেটে যাই। একটি পরিপক্ব গাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি রস পাওয়া সম্ভব।”
তবে গ্রামবাংলার এই আবহমান সৌন্দর্যের আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে পরিবেশবান্ধব খেজুর গাছের সংখ্যা। সচেতনতার অভাব, রাস্তাঘাট চওড়া করার নামে গাছ নিধন এবং ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে অবৈধভাবে ব্যবহারের কারণে কমে যাচ্ছে খেজুর বাগান। একসময় যা অবহেলায় প্রাকৃতিক উপায়ে বেড়ে উঠত, তা আজ দুষ্প্রাপ্য হতে বসেছে। ফলে উৎপাদন কমায় ব্যাহত হচ্ছে গুড় তৈরির ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
এলাকার সুধীজনদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় অবহেলা কাটিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বসতবাড়ির সীমানা, রাস্তার দু’পাশ এবং পরিত্যক্ত জমিতে নতুন করে খেজুরের চারা রোপণ ও সঠিক যত্নের তাগিদ দিয়েছেন তারা। বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে না হলেও নিজ নিজ উদ্যোগে প্রথানুসারে নতুন গাছ লাগালে আগামী প্রজন্মকে অন্তত এই সুমিষ্ট রস ও ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হতে হবে না।
সব প্রস্তুতি শেষে এখন কেবলই রসের ধারায় হাঁড়ি ভরার অপেক্ষা। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই ভাঁটি ঘরে ঘরে নামবে নলেন গুড় ও পাটালি তৈরির মহোৎসব, যা ফাল্গুন পর্যন্ত গ্রামবাংলার জনজীবনকে রাখবে রসালো ও মুখরিত।

