বিশেষ প্রতিবেদক
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেলেও ঝিনাইদহের মাঠে তলে তলে এক নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতিসহ জ্যেষ্ঠ তিন নেতাকে নাশকতা ও গোপন ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি); অন্যদিকে সমস্ত রাষ্ট্রীয় নজরদারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল মিটিং সম্পন্ন হচ্ছে। পরপর ঘটা এই ঘটনা দুটি কেবল স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই আলো ফেলেনি, বরং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা কাঠামোর চরম ভঙ্গুরতাকেও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।
ভারতের মাটি থেকে পলাতক আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কালীগঞ্জ উপজেলা নেতাকর্মীদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী জুম বৈঠক নিঃসন্দেহে স্থানীয় প্রশাসনের জন্য এক বিশাল চড়চাপড়। একটি নিষিদ্ধ দল বা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলের তিন শতাধিক প্রতিনিধির মাধ্যমে তৃণমূলের প্রায় ২ হাজার নেতাকর্মী দিনের আলোয় কীভাবে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলেন, তা নিয়ে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
যেখানে সাইবার মনিটরিং এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে থাকার কথা, সেখানে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকা জেলা পুলিশ ও ডিবি শাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বৈঠকে দলীয় পদ ঘোষণা এবং “আঘাত আসলে পাল্টা আঘাত” দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর নির্দেশনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত তথ্য না থাকা গোয়েন্দা ব্যর্থতার এক বড় প্রমাণ। এতে করে সাধারণ জনগণের মাঝে এই প্রশ্নও উঠছে—স্থানীয় প্রশাসন বা গোয়েন্দাদের মধ্যে কি এখনও আড়ালে থেকে যাওয়া কোনো রাজনৈতিক শিথিলতা বা সখ্য কাজ করছে?
শেখ হাসিনার বক্তব্যের রাজনৈতিক ভাষা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ এখন আর শুধু আত্মগোপনে থেকে আত্মরক্ষা করার মোডে নেই। কালীগঞ্জের প্রয়াত এমপি আনারের প্রসঙ্গ টেনে “আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না” এবং “আঘাত আসলে পাল্টা আঘাত দিতে হবে”—এই বাক্যগুলোর মধ্য দিয়ে তৃণমূলকে চাঙ্গা করার এবং প্রতিরোধের মানসিকতা তৈরি করার এক সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে কৌশলগতভাবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের বিষয়গুলোকে (যেমন: জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, সার সংকট) রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা তাদের মাঠপর্যায়ে পুনর্বাসনের নতুন কৌশলকেই নির্দেশ করে।
বিষয়খালী বাজারের একটি পেট্রোল পাম্প থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি তুহিন রেজাসহ ৩ জনকে আটকের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রকাশ্যে রাজপথে নামতে না পারলেও আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতারা জেলায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পেট্রোল পাম্প বা গোপন আস্তানাগুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে তারা নতুন করে নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন।
তবে শুধু মাঠ পর্যায়ের দু-একজনকে গ্রেপ্তার করে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন, তা জুম বৈঠকের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। একদিকে গ্রেপ্তার, অন্যদিকে সর্বাধিনায়কের নির্দেশনায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার নেতাকর্মীর একত্রীকরণ—সব মিলিয়ে ঝিনাইদহের রাজনৈতিক মাঠে একটি প্রচ্ছন্ন সংঘাতময় আবহ তৈরি হচ্ছে।
ঝিনাইদহে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এই গোপন তৎপরতা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের ভার্চুয়াল উপস্থিতি স্থানীয় বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা বিএনপির প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে, তারা মাঠের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতার সুযোগে যদি মাঠপর্যায়ে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়, তবে জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে পারে।
ঝিনাইদহের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনাই একটি বাস্তবতার দিকে নির্দেশ করে: ক্ষমতা হারালেও প্রযুক্তি ও গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এই স্পর্শকাতর সময়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এমন শিথিলতা এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতা বজায় থাকলে, স্থানীয় রাজনীতি কেবল উত্তপ্তই হবে না—বরং তা জেলাজুড়ে নতুন কোনো সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় প্রশাসন কেবল প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যি সত্যি কোনো কার্যকর সাইবার ও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা কৌশল গ্রহণ করবে।