বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ
৮ মাসে ঝিনাইদহে আধিপত্যের রাজনীতিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত ৩৭০, ২০০ বাড়িঘরে তাণ্ডবে কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে । ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত আট মাসে জেলার শৈলকুপা, মহেশপুর ও সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় গ্রামভিত্তিক দলাদলি ও ‘দলপাকানো’ সংস্কৃতির বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত চারজন। অনলাইন অনুসন্ধান ও ঝিনেদার কাগজসহ স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য আট মাসে জেলাজুড়ে ছোট-বড় অন্তত ৭০টিরও বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘাতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, প্রতিটি বড় সংঘর্ষে গড়ে ১০ থেকে ৬০ জন পর্যন্ত মারাত্মক আহত হয়েছেন। গত আট মাসে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অন্তত ৩৭০ জন। কেবল শারীরিক সংঘাতই নয়, প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দিতে চালানো হয়েছে পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ। এ সময়ে জেলার অন্তত ২০০টি বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, আসবাবপত্র ভাঙচুর, ধান-চাল ও গবাদিপশু লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
সংঘাতের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা ও কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অত্যন্ত নগণ্য ও তুচ্ছ বিরোধও সামাজিক মেরুকরণের কারণে মুহূর্তের মধ্যে সশস্ত্র রূপ নিচ্ছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর শৈলকুপা উপজেলার নাগিরাট গ্রামে সার কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে দুই ব্যক্তির বাকবিতণ্ডা শুরু হলেও তা দ্রুত সামাজিক কোন্দলে রূপ নেয়। এর জেরে বগুড়া ইউনিয়নের দলিলপুর গ্রামে স্থানীয় মাতব্বর শাহিন বিশ্বাস ও আবু জাহিদের অনুসারীরা রামদা, ফালা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়। এই ঘটনায় ১২ জন গুরুতর আহত হন এবং প্রতিপক্ষের অন্তত ২০টি বাড়িঘর ও দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। একই দিন মহেশপুরের যাদবপুর গ্রামে শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে শুরু হওয়া বিবাদে অভিভাবকরা জড়িত হয়ে পড়লে তা গ্রামভিত্তিক সংঘাতের রূপ নেয়, যেখানে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেলের আঘাতে রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি গণপিটুনিতে নিহত হন। এর আগে গত ১৩ আগস্ট সদর উপজেলার ফুরসন্দি ইউনিয়নের ধনঞ্জয়পুর গ্রামে সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জাহিদ বিশ্বাস ও শাহাবুর রহমানের সমর্থকদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের কোপে ১০ জন রক্তাক্ত হন। একইভাবে গত ২৩ এপ্রিল শৈলকুপার মনোহরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে জাহিদ চৌধুরী ও সাদাত গ্রুপের মধ্যে সামন্তীয় আধিপত্যের লড়াইয়ে মোহন শেখ নামে ৬০ বছর বয়সী এক সাধারণ কৃষক প্রাণ হারান এবং আহত হন অন্তত ১০ থেকে ১১ জন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে মূলত তিনটি গভীর সামাজিক ব্যাধি। প্রথমত, গ্রামীণ সমাজে বিচার-সালিশ, হাট-বাজারের কর্তৃত্ব ও নিজেদের প্রাধান্য টিকিয়ে রাখতে প্রভাবশালী মাতব্বররা সাধারণ মানুষকে কৃত্রিমভাবে দুটি দলে বিভক্ত রাখেন এবং তুচ্ছ ঘটনা ঘটলেই রামদা, ঢাল, সরকি ও ফালা নিয়ে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেন।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক কোন্দল এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ ব্যাকআপ পাওয়ায় সামান্য সার বিক্রি বা শিশুদের বিবাদের মতো নগণ্য ঘটনাতেও অস্ত্র হাতে নামতে অপরাধীরা ভয় পায় না।
তৃতীয়ত, সংঘাত শেষে বিজয়ী বা প্রভাবশালী পক্ষ পরাজিত পক্ষের বাড়িঘর ভেঙে, আসবাবপত্র গুঁড়িয়ে দেয় এবং গবাদিপশু, স্বর্ণালঙ্কার ও গচ্ছিত টাকা লুট করে নিয়ে যায়, যাতে প্রতিপক্ষ অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে কোনো আইনি বা সামাজিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।
এই নিরবচ্ছিন্ন সহিংসতার প্রভাবে পুরো ঝিনাইদহের গ্রামীণ জনজীবন এখন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। প্রতিটি সংঘর্ষের ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢালাও গ্রেপ্তার অভিযান ও প্রতিপক্ষের পাল্টা মামলার ভয়ে শৈলকুপা ও মহেশপুরের একাধিক গ্রাম রাতারাতি পুরুষশূন্য হয়ে যাচ্ছে। মাঠে পাকা ধান বা ফসল থাকলেও তা কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি ও হাট-বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যে। পুরুষ সদস্যরা এলাকাছাড়া থাকায় নির্ঘুম ও আতঙ্কের রাত কাটাচ্ছেন নারী ও শিশুরা, আর থমথমে পরিস্থিতির কারণে স্থায়ীভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা। এই তাণ্ডব থেকে রেহাই পেতে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা অতি দ্রুত শৈলকুপা, মহেশপুর ও সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে অবৈধ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং সংঘাতের নেপথ্যে থাকা উসকানিদাতা মাতব্বর ও তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।