ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
সাংবাদিক হামলায় নীরবতা, হামলার ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেওয়া, আসামির মোবাইল ফোন গায়েবের চেষ্টা, মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসিক মাসোহারা আদায় ও মামলায় আসামি বদলের অভিযোগ—এসব কারণেই কি অবশেষে প্রত্যাহার হলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানার আলোচিত ওসি জেল্লাল হোসেন? শনিবার (৮ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত (ওআর) করা হয়। যদিও প্রশাসন একে “নিয়মিত পোস্টিং” বলছে, তার বিরুদ্ধে জমে থাকা একের পর এক অভিযোগ ভিন্ন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
গত ১৭ জুলাই কালীগঞ্জ থানায় ওসি জেল্লাল হোসেনের সামনেই দৈনিক যুগান্তর ও দীপ্ত টেলিভিশনের প্রতিনিধি শাহরিয়ার আলম সোহাগ এবং নাগরিক টিভির মিশন আলীর ওপর হামলা চালায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। হামলাকারীদের সঙ্গে ওসির সখ্য থাকায় তাদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করান তিনি বলে অভিযোগ। এজাহার দেওয়ার ১০ ঘণ্টা পর মামলা রেকর্ড করেন তিনি, এমনকি হামলাকারীদের সঙ্গে থানায় সালিশ বসিয়ে বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সংবাদকর্মী মিশন আলী বলেন, ওসির সামনে তার পেটুয়া বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে, আর ওসি তাদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করিয়ে দেন।
গত ১১ জুন বালিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে আটক নাজমুল হোসেন নামে একজনের কাছ থেকে ২ পিস ইয়াবা পাওয়া গেলেও ১০ পিস দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। একই সময় টেবিলের ওপর থাকা দুটি স্মার্টফোন গায়েব করার চেষ্টা করেন ওসি বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি ১৫ জুলাই গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে পরদিন ফোন দুটি ফেরত দেওয়া হয়, আর গঠন করা হয় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি।
গত ২৩ জুন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বিজুকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় প্রথমে তাকে ১নং আসামি করা হয়েছে বলে ওসি নিজেই গণমাধ্যমকর্মীদের জানান। পরে তাকে ৯নং আসামি দেখিয়ে মামলা রেকর্ড করা হয়।
শহরের আড়পাড়া এলাকার এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসিক ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর কালীগঞ্জে যোগদানের পর মাদকবিরোধী অভিযান একদমই কমে যায় বলে অভিযোগ, যার প্রতিবাদে সম্প্রতি এলাকাবাসী নিজেরাই পাড়া-মহল্লায় অভিযানে নামে। উপজেলাজুড়ে চুরি-ডাকাতিসহ আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হলেও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের আটক না করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কালীগঞ্জে যোগদানের আগে যশোরের চৌগাছা থানায় ওসি (তদন্ত) থাকাকালীন এক যুবলীগ নেতার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে সালিশ বাণিজ্য করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি নৌকা প্রতীক বসানো চেয়ারে বসা নিজের একটি ছবিও ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তিনি।
অফিস আদেশে কালীগঞ্জের ওসি জেল্লাল হোসেনকে পুলিশ লাইন্সে ওআর, পুলিশ লাইন্সের ওআর কবির হোসেনকে কালীগঞ্জ থানার নতুন ওসি এবং সদর সার্কেলে সংযুক্ত মো. জুলফিকার আলীকে হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ বিল্লাল হোসেন জানান, হরিণাকুণ্ডুতে ওসি না থাকায় সেখানে জুলফিকার আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি একটি নিয়মিত পোস্টিং।