ঝিনাইদহে আমন ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে

ঝিনাইদহে আমন ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

চলতি আমন মৌসুমে ঝিনাইদহে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলায় এবার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। মাঠে মাঠে এখন সবুজ ধানের ঢেউ। কোথাও কোথাও আগাম জাতের ধানে পাক ধরতে শুরু করেছে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত সারের সরবরাহ এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম থাকায় এবার আমনের ভালো ফলন পাওয়ার আশা করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।

ধানের শিষে শিষে দানা ভরতে শুরু করায় কৃষকের চোখ এখন পাকা ধানের দিকে। গ্রামে গ্রামে, বাড়িতে বাড়িতে চলছে নতুন ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি। অনেক কৃষক আগাম জাতের ধান কাটতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে, যেসব জমিতে ধান এখনো পুরোপুরি পাকার অপেক্ষায় রয়েছে, সেসব জমিতে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা করছেন কৃষকেরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জেলার অধিকাংশ মাঠে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় ধান আবাদের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি। তবে আমন চাষে কৃষকদের আগ্রহ ও উৎসাহের কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ১০০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এতে চলতি মৌসুমে জেলায় মোট আমন আবাদ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে।

উপজেলাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় ২৫ হাজার ২৫২ হেক্টর, শৈলকুপায় ২৪ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১৮ হাজার ৭৩৪ হেক্টর, মহেশপুরে ১৮ হাজার ১৫৫ হেক্টর, হরিণাকুণ্ডুতে ১১ হাজার ২৩২ হেক্টর এবং কোটচাঁদপুরে ৬ হাজার ১৮২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় ধানের গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। পাশাপাশি সারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় কৃষকদের চাষাবাদে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ধানের পরিচর্যা, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে ধানের ক্ষেতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রামনগর গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, এ বছর আমন ধান আবাদের সময় আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। জমিতে সময়মতো প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে পারায় ধানের গাছে রোগবালাইয়ের আক্রমণও খুব একটা দেখা যায়নি। অতিবৃষ্টি কিংবা বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় ধানের গাছ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে। মাঠের বর্তমান অবস্থা দেখে ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।

একই উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, এখন ধানের শেষ পর্যায়ের পরিচর্যা চলছে। কিছু জমিতে আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। অন্য জমিগুলোতে ধান পাকার অপেক্ষায় রয়েছেন কৃষকেরা। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মাঠজুড়ে ধান কাটার ব্যস্ততা বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি। এবার ধানের আবাদ ভালো হয়েছে, তাই ফলনও ভালো হবে বলে আশা করছেন এই কৃষক।

হরিণাকুণ্ডু উপজেলার সিংগা গ্রামের কৃষক লাল্টু মিয়া বলেন, মাঠের ধান দেখে ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা মনে হচ্ছে। তবে ধান পুরোপুরি পাকার আগ পর্যন্ত আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে। শেষ মুহূর্তে আকস্মিক ঝড়, দমকা হাওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ধানের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকবে বলে মনে করছেন তিনি।

কৃষকদের মতে, ধান পাকার শেষ পর্যায়ে আবহাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় অতিবৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া কিংবা জলাবদ্ধতা দেখা দিলে ধানগাছ হেলে পড়াসহ নানা ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই কাঙ্ক্ষিত ফলন ঘরে তুলতে এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকার পাশাপাশি জমির নিয়মিত পরিচর্যার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, আমন মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন কৃষি বিভাগের মাঠকর্মী ও কর্মকর্তারা। তাঁরা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে ছিল এবং সারের সরবরাহও পর্যাপ্ত ছিল। সবকিছু মিলিয়ে এবার ঝিনাইদহে আমন ধানের ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ধান পাকার আগ পর্যন্ত কৃষকদের সতর্কতার সঙ্গে জমির পরিচর্যা করতে হবে। রোগবালাইয়ের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ধান কাটার প্রস্তুতি নিতে হবে। কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফলন ঘরে তুলতে পারলে জেলার খাদ্য উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ঝিনাইদহে উৎপাদিত ধান স্থানীয় খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক খাদ্য চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সব মিলিয়ে চলতি আমন মৌসুমে ঝিনাইদহে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখন কৃষকদের অপেক্ষা ধান ঘরে তোলার। শেষ সময়ে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার ভালো ফলনের মাধ্যমে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে—এমন প্রত্যাশা কৃষক ও কৃষি বিভাগের।

আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত
ঝিনাইদহে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন
উদ্বোধনের ৮ বছরেও চালু হয়নি ঝিনাইদহের ৪ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র
ঝিনাইদহে অনুমোদনহীন ভেটেরিনারি প্রতিষ্ঠানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
কালীগঞ্জে ডোপ টেস্টে মাদক সেবনের প্রমাণ, ৫ জনের কারাদণ্ড
ঝিনাইদহে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা, চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার
Scroll to Top