কালীগঞ্জ(ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
চলতি আমন মৌসুমে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় সারের সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি ডিলার ও সাব-ডিলারদের কাছে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এতে আমন চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদার তুলনায় অল্প পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে তাদের খোলা বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে বেশি দাম নেওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ, সার বিতরণে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, সরকার কৃষিতে সারের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কালীগঞ্জ উপজেলায় ইউরিয়ার চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ১৮১ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন। টিএসপির চাহিদা ৩ হাজার ৭৭৮ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৩ হাজার ৬০০ টন। ডিএপির চাহিদা ৭ হাজার ২৫৫ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৬ হাজার ৪১০ টন এবং এমওপির চাহিদা ৪ হাজার ৬৭ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৭৩৪ হেক্টর। চলতি অর্থবছরেও একই পরিমাণ জমি চাষযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে গত অর্থবছরের সঙ্গে চলতি অর্থবছরের সারের চাহিদা তুলনা করলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরিয়ার চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৩ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যায় ১০ হাজার ১৫০ টন। টিএসপির চাহিদা ছিল ৮ হাজার ২৬০ মেট্রিক টন, বরাদ্দ ৩ হাজার ৪৪০ টন। ডিএপির চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৩৭০ টন, বরাদ্দ ৬ হাজার ৬০০ টন। এমওপির চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৯০ মেট্রিক টন, বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ হাজার ৭৯০ টন।
উপজেলার একাধিক বিসিআইসি ডিলার ও সাব-ডিলারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত মোট চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম আসে। তবে চলতি অর্থবছরে চাহিদা কম নির্ধারণ করায় বরাদ্দও তার প্রভাব পড়েছে বলে দাবি তাদের।
মালিয়াট গ্রামের কৃষক সুমন হোসেন বলেন, সরকারি ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাওয়া যাচ্ছে না। আমার ৫০ কেজি সার প্রয়োজন হলেও ডিলার বা সাব-ডিলারের কাছ থেকে ১০ কেজির বেশি পাচ্ছি না। অথচ পাশের খুচরা দোকানে সার পাওয়া যাচ্ছে, তবে বেশি দামে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সার বিতরণের তালিকা তৈরিতে প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কেউ কেউ বাদ পড়ছেন। এ ক্ষেত্রে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
কৃষকদের অভিযোগ, সার বিতরণে কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সুযোগ নিচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সারের সংকটের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব আলম রনির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরকার কৃষকদের সারের ব্যবহার কমানোর কথা বলছে। এ ছাড়া কৃষকেরা ড্রাগনসহ বিভিন্ন ফসলে বেশি সার ব্যবহার করেন, যার প্রভাব ধানের ক্ষেত্রেও পড়ে।
চলতি অর্থবছরে সারের চাহিদা গতবারের তুলনায় কম দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, এবারও সারের চাহিদা গতবারের চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের বেশি দামে সার কেনার বিষয়টি তিনি অবগত আছেন বলেও জানান।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, কোনো অবস্থাতেই সারের সংকট তৈরি করা যাবে না। সিন্ডিকেট কিংবা সার সংকট তৈরি করে কেউ অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কৃষকেরা বলছেন, আমন মৌসুমে সময়মতো প্রয়োজনীয় সার না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চাষের খরচও বাড়বে। তাই দ্রুত সরকারি ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার এবং প্রকৃত কৃষকদের কাছে ন্যায্য দামে সার পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।