নিজস্ব প্রতিবেদক
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে শ্রমিক ছাড়াই ভেকু দিয়ে খাল খনন, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সেচ সংকটে কৃষকেরা। অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় নেওয়া খাল পুনর্খনন কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। সরকারি টেন্ডারপত্রের সুস্পষ্ট শর্ত ভেঙে কাজের জন্য অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ না করে নির্বিচারে ব্যবহার করা হয়েছে ভারী যন্ত্র এক্সকাভেটর (ভেকু)। এমনকি ভুয়া শ্রমিকের দীর্ঘ তালিকা সাজিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রকল্পের বিপুল অর্থ। টেন্ডারের চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত খালের পরিবর্তে কোনো প্রকার পূর্বানুমোদন ছাড়াই খনন করা হয়েছে সংরক্ষিত সেচ খাল।
বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গৃহীত এই খাল খনন প্রকল্প থেকে এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট অসাধু মহল ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সাধারণ কৃষকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এভাবে অপরিকল্পিতভাবে খনন করা খাল তাঁদের চাষাবাদে কোনো কাজেই আসবে না; বরং কৃষি উৎপাদন ও সেচের ক্ষেত্রে উল্টো মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে বলে তাঁরা চরম শঙ্কায় রয়েছেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দের অধীনে উপজেলার ‘ডি-১২এক্সকে ড্রেনেজ খাল’ এবং কেসমত ঘোড়াগাছা গ্রামের ‘১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খাল’ পুনর্খননের অনুমোদন প্রদান করা হয়। যৌথভাবে এই দুটি খাল খনন প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল এক কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
প্রকল্পের মূল নীতিমালা ও টেন্ডারের শর্তাবলীতে উল্লেখ ছিল, হরিণাকুণ্ডু উপজেলার জোড়াদহ জটার খাল খনন সম্পন্ন করতে ২৯৩ জন অদক্ষ শ্রমিক নিয়োজিত থাকবেন। চুক্তিমূল্যের বিনিময়ে এসব শ্রমিক দিয়ে টানা ৪৩ দিন কাজ করানোর স্পষ্ট নিয়ম নির্দিষ্ট করা ছিল। মূলত গ্রামীণ অতিদরিদ্র পরিবারের জন্য সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল এই শর্তের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে সেই সরকারি নিয়মের সামান্যতম বাস্তবায়নও ঘটেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই কায়দায় ভায়না ইউনিয়নের কেসমত ঘোড়াগাছা (কাটাখাল) অংশের নির্ধারিত কাজের জন্য ৭৮ জন অদক্ষ শ্রমিককে নিয়োজিত করার নিয়ম নির্দেশিত ছিল। অথচ সেখানেও টেন্ডারের সমস্ত নীতিমালা ও আইনি বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে। কেসমত ঘোড়াগাছা অংশেও হতদরিদ্র শ্রমিকের বদলে সাবলীলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ভারী এক্সকাভেটর বা ভেকু গাড়ি।
অনুসন্ধানী তথ্যে জানা যায়, মানবিক কর্মসংস্থানের সুযোগ কেড়ে নিয়ে দুটি খালের মাটি কাটার কাজ পুরোটাই শেষ করা হয়েছে ভেকু যন্ত্র দিয়ে। এখানেই শেষ নয়, টেন্ডারপত্রে অনুমোদন থাকা নির্দিষ্ট ১-ডি-১১-এন খালের স্থান বদলে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত উপায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনস্থ শিতলী ও পায়রাডাঙ্গা এলাকার প্রায় ১.৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যসম্পন্ন সংরক্ষিত ‘জিকে সেচ প্রকল্পের টার্শিয়ারি সেচ খাল’ কেটে ফেলা হয়েছে। এই সংরক্ষিত খাল খননের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুমোদিত কারিগরি নকশা মানা হয়নি। উল্টো খালের স্বাভাবিক দুই পাড়ে থাকা বিপুল সংখ্যক পুরোনো ফলদ ও বনজ গাছ কেটে উজাড় করার চাঞ্চল্যকর খবর পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস জানান, পাউবোর মালিকানাধীন সংরক্ষিত সেচ খাল চাইলেই কেউ এভাবে খনন করে ফেলতে পারে না; এটি কেবল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রকৌশল নকশা অনুসরণে পুনঃআকৃতি দেওয়া সম্ভব। তবে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা পিআইও দপ্তর এ কাজের বিষয়ে কোনো টেকনিক্যাল মতামত কিংবা নকশার বিষয়ে আমাদের কাছে আবেদন করেনি। তদুপরি খালের ভেতরের অংশে অপরিকল্পিতভাবে গাছ রোপণ করা হয়েছে, যা আগামীতে সেচের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকে দেওয়ার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
কাজের এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় স্থানীয় ভুক্তভোগী চাষিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অনিয়মভিত্তিক খননপ্রক্রিয়ার ফলে খালের তলদেশ সংলগ্ন কৃষিজমির চেয়ে অনেক বেশি গভীর হয়ে পড়েছে। ফলে চাষের জন্য জমিতে দেওয়া সেচের পানি উল্টো নেমে খালে তলিয়ে যাওয়ার মারাত্মক শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকেরা।
হরিশপুর গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষক রেজাউল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জটার খালের কোনো অংশে একজন শ্রমিকও এক কোদাল মাটি কাটেননি, এর পুরো কাজটাই শেষ করা হয়েছে ভেকু দিয়ে। খাল সংস্কারের দোহাই দিয়ে কেবল পিআইও এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজন নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। পূর্বে অন্তত খালে পানি জমে থাকত। কিন্তু এখন এমন অস্বাভাবিকভাবে কাটা হয়েছে যে, কোথাও অনেক গভীর আবার কোথাও উঁচু। এই পরিস্থিতির কারণে আমাদের জমিতে পানি সেচ দেওয়াটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুরূপ সুর মিলিয়ে উপজেলার শিতলী এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে মাটি কাটায় খালের তলদেশ আবাদি জমির চেয়েও অতিরিক্ত নিচে নেমে গেছে। এর ফলে সেচকাজে এই খাল কোনো উপকারে আসবেই না, বরং খেসারত দিতে হবে আমাদের। চাষের জমির পানি খালে গড়িয়ে পড়বে, যার কারণে সেচের খরচ একলাফে কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
তবে প্রকল্প ঘিরে ওঠা সব অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ একবাক্যে নাকচ করেছেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আজিজুর রহমান। তিনি দাবি করেন, খাল খননের কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি সংঘটিত হয়নি। অনুমোদিত খালের জায়গায় অন্য খালের অংশ খনন করা হয়ে থাকলেও তা পরবর্তীতে নিয়মানুযায়ী সংশোধনের জন্য ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
‘কাজের জন্য অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি কেন’—এমন প্রশ্নের জবাবে পিআইও আজিজুর রহমান জানান, সঠিক নিয়ম মেনেই শ্রমিকের তালিকা প্রস্তুত ও নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছিল। কোনো শ্রমিক কত দিন কাজ করেছেন কিংবা মাঠে কতজন উপস্থিত ছিলেন, তার সম্পূর্ণ হিসাব ইউনিয়ন পরিষদের পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) সংশ্লিষ্টরা দিতে পারবেন। এর বাইরের কোনো বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
অপরদিকে, জোড়াদহ জটার খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি (পিআইসি) ও ইউপি সদস্য আনিসুর রহমান বলেন, সরকারি সমস্ত বিধি মেনেই তারা মাঠের কাজ সম্পাদন করেছেন। কাজ চলাকালীন শ্রমিকদের দিয়েও মাটি কাটানো হয়েছে, তবে বাস্তবতার নিরিখে যেখানে এক্সকাভেটর দরকার পড়েছে সেখানে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
‘কাগজে-কলমে বেশি শ্রমিকের সংখ্যা দেখিয়ে বাস্তবে কম শ্রমিক নামানোর’ বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি উত্তর দেন, তিনি এত সূক্ষ্ম বিষয় জানেন না। পিআইও সাহেব যেহেতু সরকারি কর্মকর্তা, তাই তিনি যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সেই কাঠামোর ভেতরেই কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু ভুয়া শ্রমিকের নাম ভাঙিয়ে টাকা তোলার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি আর কোনো উত্তর না দিয়ে নীরব থাকেন।
অন্যদিকে, কেসমত ঘোড়াগাছা ১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খাল (কাটাখাল) খনন প্রকল্পের পিআইসির দায়িত্বে থাকা ভায়না ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) রবিউল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বক্তব্য নেওয়ার জন্য বহুবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও তাঁকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সমগ্র বিষয়টির আইনগত অগ্রগতি বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন বলেন, দুটি খাল খননে দুর্নীতির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনিকভাবে তদন্তপ্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অদক্ষ শ্রমিকের ভুয়া তথ্য ও তাঁদের পারিশ্রমিকসংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনার সত্যতা স্পষ্ট হয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কাজ চলছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন দৃঢ় আশ্বস্ত করে বলেন, খাল খনন নিয়ে দুর্নীতির তথ্য আমাদের গোচরে এসেছে। আমরা ইতিমধ্যেই সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে সরকারি রিপোর্ট প্রস্তুত করে পাঠাচ্ছি। তদন্তে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।