একরামুল ইসলাম তুষার
পে-স্কেল বা বেতন স্কেল হলো সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন নির্ধারণের কাঠামো। কোন পদ কোন গ্রেডে থাকবে, সেই গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন কত হবে এবং চাকরির মেয়াদে বেতন কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়বে—এসব বিষয় এই কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়ে একজন সরকারি চাকরিজীবীর মোট বেতন নির্ধারিত হয়।
প্রতি ৫ বছর পর পর নতুন পে-স্কেল বা জাতীয় বেতন কাঠামো গঠনের নিয়ম বা প্রচলন রয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এটি সবসময় মানা হয় না।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, ক্যাডার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই গ্রেডে একাধিক ধরনের পদ থাকতে পারে। আবার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা বেতন আদেশও রয়েছে।
নতুন বেতন স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তি হওয়ার বিষয়টি আগেই নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে পৃথক চিঠি কবে জারি করা হবে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে । বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে।
এমপিওভুক্ত জনবল ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্যও পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। শিগগিরই তাদের জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’
চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে। আগামী নভেম্বর মাসে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতন পেতে পারেন। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার তথ্য আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারে এন্ট্রি দিতে হয়। প্রতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে এ তথ্য পাঠাতে হয়। ইতোমধ্যে অধিকাংশ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতার তথ্য সাবমিট করেছেন। সে হিসেবে সেপ্টেম্বরে বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
রবিবার পর্যন্ত বেতনের তথ্য আইবাসে পাঠানোর সময়সীমা রয়েছে। অক্টোবরের মাস থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই বাড়তি অর্থ গত ৩০ জুন আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতনকাঠামোতে বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। আর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে।
১ জুলাই থেকে যেহেতু নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছে, তাই বকেয়া বেতনও পাবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি নতুন বেতনকাঠামোর অন্য সব ভাতা পাওয়া শুরু করবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন বেতনকাঠামোর যাবতীয় সব সুবিধা পাবেন।
নতুন বেতনকাঠামোতে ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়বে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়বে।
এর আগে ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন প্রজ্ঞাপন জারি হল। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিই সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে এ বছরের ২১ জানুয়ারি। কমিশনপ্রধান সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান।
গেজেট অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা প্রতি মাসে চিকিৎসা ভাতা হিসেবে পাবেন। পে-স্কেলের আওতায় আসায় সরকারি স্কুল বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও মাসিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন।
তবে এই ভাতা পাবেন না বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা। তারা পূর্বের ন্যায় মাসিক ৫০০ টাকা হারে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। ফলে বিষয়টিকে চরম বৈষম্য দাবি করেছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা।
নবম পে-স্কেলের গেজেটে চিকিৎসা ভাতা সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে, ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধাদি যাহা সরকার কর্তৃক, সময়ে সময়ে জারীকৃত আদেশের মাধ্যমে প্রদান করা হইয়াছে তাহা যথারীতি বলবৎ থাকিবে এবং কর্মচারীগণ ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাসিক ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা এবং ৫০ বৎসর ১ দিন হইতে পিআরএল শেষ হওয়া পর্যন্ত মাসিক ৪০০০ (চার হাজার) টাকা চিকিৎসা ভাতা প্রাপ্য হইবেন।’
এতে আরও বলা হয়, ‘অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ভাতা ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাসিক ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা, ৫০ বৎসর ১ দিন হইতে ৬০ বৎসর পর্যন্ত মাসিক ৪০০০ (চার হাজার) টাকা, ৬০ বৎসর ০১ দিন হইতে ৭০ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাসিক ৫০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা এবং ৭০ বৎসরের ঊর্ধ্বে মাসিক ৬০০০ (ছয় হাজার) টাকা হইবে: তবে শর্ত থাকে যে, কোনও মূল পেনশনভোগী হইতে উদ্ভূত একাধিক পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে মূল পেনশনভোগীর প্রাপ্য চিকিৎসা ভাতাকে ভিত্তি ধরিয়া বিধি মোতাবেক আনুপাতিক হারে বণ্টন করিতে হইবে।’
পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের চিকিৎসা ভাতা বাড়ানো হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা বাড়েনি দীর্ঘদিন ধরে। এমনকি শিক্ষক-কর্মচারীদের শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির আন্দোলনে চিকিৎসা ভাতা এক হাজার টাকা করার দাবি উঠলেও তা আজও পূরণ হয়নি।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে অনেক বলেন যে,-বিষয়টি চরম বৈষম্যমূলক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বৈষম্যের শিকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। বর্তমান সময়ে যেখানে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ফি এক হাজার টাকার বেশি। সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিমাসে ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা কীভাবে দেওয়া হয় সেটি আমাদের বোধগম্য নয়।’
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকরাও চিকিৎসা ভাতা পাবেন ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধা কোনোটিই কম নয় তা সত্ত্বেও তাদের চিকিৎসা সহ অন্যান্য ভাতা অনেক কম। অবিলম্বে তাদের চিকিৎসা সহ অন্যান্য ভাতা বাড়ানো হোক।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।