শৈলকুপা ও ঝিনাইদহে

রক্তাক্ত ‘দলপাকানো’ রাজনীতি: শৈলকুপা ও ঝিনাইদহের চিরন্তন সামাজিক ক্ষত

শেখ জিল্লুর রহমান

শেখ জিল্লুর রহমান

ছোট্ট এক বস্তা সার কেনাবেচা নিয়ে দোকানদার ও ক্রেতার মধ্যে সামান্য কথাকাটাকাটি। অত্যন্ত সাধারণ ও তুচ্ছ এই ঘটনা থেকেই মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে রূপ নিল ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দলিলপুর গ্রাম। তুচ্ছ বিরোধের জেরে মুহূর্তের মধ্যে ঢাল, সরকি, রামদা, ফালা ও লাঠিসোঁটার মতো দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হলো গ্রামের দুটি পক্ষ। ঘণ্টাখানেক ধরে চলা এই তাণ্ডব ও অস্ত্রের উন্মুক্ত ঝনঝনানিতে পুরো এলাকা থমকে যায়। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন। তবে তাণ্ডব কেবল শারীরিক আঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিজয়ী ও প্রভাবশালী পক্ষ প্রতিপক্ষের একাধিক বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে কয়েকটি পরিবারকে এক ঘণ্টার মধ্যে নিঃস্ব করে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও দলিলপুর গ্রামে আজ শুধুই মানুষের আতঙ্ক, আহাজারি আর গভীর অনিশ্চয়তা।

শৈলকুপার দলিলপুর গ্রামের এই তাণ্ডব কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত সমগ্র ঝিনাইদহ জেলার গ্রামীণ জনপদের এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি ও সামাজিক ক্ষতের প্রতিচ্ছবি। গত ছয় মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক সহিংসতার চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে সামাজিক আধিপত্য বিস্তার, গ্রামীণ প্রভাব ধরে রাখা কিংবা তথাকথিত ‘দলপাকানো’ কেন্দ্রিক সংঘাত এখন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। তুচ্ছ অজুহাতে রক্তপাত, ভাঙচুর ও লুটপাট যেন এই জনপদের নিয়মিত চিত্র। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এত সাধারণ ও নগণ্য বিষয় নিয়ে কেন বারবার কেঁপে ওঠে ঝিনাইদহের শান্ত গ্রামগুলো? কেনই বা সামান্য বিবাদে সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি ভাঙচুর, বসতবাড়িতে তাণ্ডব আর রক্তপাত অনিবার্য হয়ে ওঠে?

এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সংঘাত ও সহিংসতার গভীর বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মৌলিক কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংঘাতের নেপথ্যে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তথাকথিত ‘সামাজিক মাতব্বরি’ ও বংশগত প্রভাবের লড়াই। গ্রামীণ বিচার-সালিশ, হাট-বাজারের কর্তৃত্ব এবং পুরো সমাজকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি গ্রামে নিজস্ব বলয় বা পক্ষ তৈরি করে। নিজেদের এই মাতব্বরি টিকিয়ে রাখতে এবং আনুগত্য প্রকাশকারী অনুসারীর সংখ্যা বাড়াতে তারা সাধারণ গ্রামবাসীকে কৌশলে দুটি ধারায় বিভক্ত রাখে। সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে মাঠে নামানো এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করাই তাদের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় এই সামাজিক দলাদলি বা সংঘাত কেবল গ্রামীণ বিচার-সালিশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয় রাজনৈতিক আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা। গ্রামীণ মাতব্বর ও গোষ্ঠীপতিরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় যায়। রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ায় অপরাধীরা মনে করে, যেকোনো তাণ্ডব চালিয়েও তারা আইনের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। ফলে স্থানীয় স্তরের সামান্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ বা তুচ্ছ কথাকাটাকাটিও পরবর্তীতে বড় আকারের গোষ্ঠীগত ও রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নেয়।

তৃতীয়ত, অতি ক্ষুদ্র ঘটনার জেরে পুঞ্জীভূত আক্রোশ ও ক্ষোভ প্রকাশের সংস্কৃতি। জমিজমা নিয়ে বিরোধ, সার কেনাবেচা, ক্ষেতে গবাদিপশু যাওয়া কিংবা শিশুদের খেলাধুলার মতো অতি নগণ্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবাদের সূত্রপাত হলেও মূলত এর পেছনে কাজ করে দীর্ঘদিন ধরে পুষে রাখা পূর্বশত্রুতা। প্রতিশোধপরায়ণতার মানসিকতা থাকার কারণে সামান্য উসকানি পেলেই অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ হাতছাড়া করে না।

চতুর্থ অনুঘটকটি হলো গ্রামে গ্রামে দেশীয় অস্ত্রের অবাধ বিস্তার ও সহজলভ্যতা। রামদা, ঢাল, সরকি, ফালা, ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা প্রতিটি গ্রামেই সহজে পাওয়া যায়। অস্ত্রের এই সহজলভ্যতার কারণে মানুষ অল্পতেই সহিংস আচরণে জড়িয়ে পড়ে, যা নিমেষেই পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায় এবং একেকটি গ্রামকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে।

সংঘাত সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ও পুলিশি অভিযান হয়তো রক্তপাত ও তাণ্ডব সাময়িকভাবে থামায়, তবে এই দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ব্যাধি ও ক্ষত দূর করতে হলে প্রয়োজন স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল সাময়িক শান্তির দিকে নজর না দিয়ে সমস্যার গভীরে যেতে হবে।

প্রথমত, সংঘাত, হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িতদের দলীয় কিংবা সামাজিক পরিচয় তোয়াক্কা না করে কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে বিচারে আওতায় আনাই হবে প্রথম পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, সহিংসতার আসল মূলচ্ছেদ করতে হলে অপরাধীদের মদদদাতা, উসকানিদাতা এবং নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়া মাতব্বরদের চিহ্নিত করতে হবে। এসব ছায়ানায়কদের আইনের জালে না আনলে গ্রামে কোনো দিন স্থায়ী শান্তি আসবে না।

তৃতীয়ত, আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজকে বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। ঝিনাইদহের প্রতিটি গ্রামে শিক্ষার আলো বিস্তার, আইনি সচেতনতা সৃষ্টি এবং অহিংস সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।

শৈলকুপার দলিলপুর কিংবা ঝিনাইদহের অন্যান্য গ্রামের সাধারণ মানুষ আর এই রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব দেখতে চায় না। মামলা, হামলা, পুরুষশূন্য গ্রাম আর নিঃস্ব হওয়ার ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সাধারণ গ্রামবাসীকে। রক্তক্ষয়ী আধিপত্যের রাজনীতি ও ‘দলপাকানো’ সামাজিক সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটে পুরো জেলাজুড়ে এক শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ ফিরে আসুক—এটাই এখন ঝিনাইদহের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের আকুল আবেদন ও একমাত্র আকুতি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

আরো পড়ুন
অস্ত্রের ঝংকার ও বহিরাগতদের ছায়ায় বদলে যাওয়া দেশে অভিন্ন তাণ্ডবে নতুন বাংলাদেশ কি পুরোনো রাজনীতিতেই ফিরছে
আরো পড়ুন
যশোরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ব্যবচ্ছেদ: রাজনৈতিক সমীকরণ, 'মব কালচার' ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেন্জ
আরো পড়ুন
Screenshot 2026-03-11 130203
আরো পড়ুন
তারেক রহমানের ফিরতে বাধা কোথায়?
আরো পড়ুন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: খুলনা বিভাগে ইসলামী জোট এবং বিএনপির আসন সম্ভাবনা
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা
আরো পড়ুন
Scroll to Top