আসাদুজ্জামান মানিক
যশোরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ব্যবচ্ছেদ: রাজনৈতিক সমীকরণ, ‘মব কালচার’ ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেন্জ। সম্প্রতি যশোরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। গত সাধারণ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ার পর অঞ্চলটির রাজনৈতিক বিন্যাসে দৃশ্যমান ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের শাসন ক্ষমতা ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী বড় দলগুলোর স্থানীয় প্রভাব একঝটকায় সংকুচিত হওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—উভয় পক্ষেই বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি যশোর-৫ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্যের বাসভবনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনা এবং তা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া তীব্র তর্ক-বিতর্ক বর্তমান বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতির এক অত্যন্ত জটিল বাস্তবতাকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।
যশোরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রথাগত হিসাব-নিকাশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো অঞ্চলে দীর্ঘদিন পর বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে পুরনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল ও সিন্ডিকেটগুলোর অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলোতে মাদক ব্যবসা, চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও নানা ধরনের অবৈধ আয়ের যে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব বদল হলে বা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্যের উদ্যোগে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় মাদকের বিরুদ্ধে যে চিরুনি অভিযান ও জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার কথা বলা হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবেই ওই এলাকার অবৈধ চোরাচালানি ও মাদক ব্যবসায়ীদের চরম অস্বস্তিতে ফেলার কথা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো অপরাধী চক্র দেখে যে তাদের প্রথাগত অনৈতিক সুবিধা বা চাদাবাজির পথ প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা সরাসরি আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উসকানি দিয়ে জনরোষ তৈরি করা কিংবা সুবিধাজনক মুহূর্তে ‘মব’ বা উত্তেজিত জনতা সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা। গ্রামীণ ও মফস্বল রাজনীতিতে এটি একটি পরিচিত চিত্র। যশোরের সাম্প্রতিক উত্তেজনার নেপথ্যে মাদক ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একটি অংশ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে—এমন বিশ্লেষণ বা অভিযোগকে তাই হুট করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের কোণঠাসা করতে বা তাদের প্রতি জনসমর্থন কমানোর উদ্দেশ্যে অপরাধী চক্র প্রায়শই স্থানীয় যেকোনো ছোট সামাজিক বিরোধকে আগুনে ঘি ঢালার অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
তবে অনলাইন প্রচার-প্রচারণা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে দেশের দায়িত্বশীল মূলধারার জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ঘটনার অন্য একটি দিকও উঠে এসেছে। অনলাইন ও জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, সংঘাতের মূল সূত্রপাত হয়েছিল মূলত স্থানীয় একটি মাদ্রাসা এবং তার সংলগ্ন রাস্তার যাতায়াত সংক্রান্ত একটি ঘরোয়া ও স্থানীয় মতবিরোধকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেদনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পারিবারিক সদস্যের সাথে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাকবিতণ্ডা এবং একপর্যায়ে হাতাহাতির অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাটিই মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত রূপ ধারণ করে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের একটি বড় অংশকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তীতে সংসদ সদস্যের বাসভবনে হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর সংসদ সদস্য নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পুরো ঘটনাটি পারিবারিক আবেগ ও মানসিক স্বাস্থ্যগত জটিলতার আলোকেও ব্যাখ্যার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, পুরো বিষয়টি একটি বিচ্ছিন্ন ও পারিবারিক ঘটনা হলেও স্থানীয় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মীরা একত্রিত হয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে হাত মিলিয়ে একটি পরিকল্পিত ‘মব’ সৃষ্টি করেছে, যাতে নতুন নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে কলঙ্কিত ও দুর্বল করা যায়।
যশোরের এই ঘটনাটি একই সাথে মাদ্রাসাশিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মাদকবিরোধী অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ দিন ধরেই মাদ্রাসাশিক্ষার সুরক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে আসছে। যশোরের পাঁচটি আসনেই এই দলের প্রার্থীদের বিশাল বিজয়ের পেছনে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের আস্থা ও মাদ্রাসাশিক্ষার সমর্থকদের বড় ভূমিকা ছিল। তাই যখন একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সাথে জনপ্রতিনিধির স্বজনদের বিরোধের খবর ছড়ায়, তখন তা জনমনে দ্রুত আবেগ সৃষ্টি করে। অপরাধী ও রাজনৈতিক চক্র এই সামাজিক আবেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ পায়।
আজকের বাংলাদেশে ‘মব কালচার’ বা উত্তেজিত জনতার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যশোরের ঘটনাটি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে যে, যেকোনো স্থানীয় বিরোধ বা অসন্তোষ প্রকাশের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও সামাজিক পথ রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সংসদ সদস্যের বাড়িতে হামলা চালানো, ভাঙচুর করা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করা কোনো অবস্থাতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বা মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এক ধরনের জঘন্য অপরাধ।
একই সাথে এই ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বড় আত্মপর্যালোচনার বার্তা দেয়। যশোরে যে বিপুল জনরায়ের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল হয়েছিল, সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে জনসেবা, সামাজিক স্বচ্ছতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই। স্থানীয় মাদক চক্র, চোরাচালানি ও চাঁদাবাজদের দমন করতে হলে শুধু প্রশাসনিক অভিযানই যথেষ্ট নয়, রাজনৈতিক কর্মীদের নিজেদের আচরণ ও পারিবারিক প্রভাবের বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ প্রতিপক্ষ সর্বদা কোনো না কোনো ভুলের সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
সবশেষ বলা যায়, যশোরের ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পারিবারিক বা স্থানীয় সংঘাত নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন, মাদক সিন্ডিকেটের টিকে থাকার লড়াই এবং ‘মব জাস্টিস’-এর সম্মিলিত এক জটিল খণ্ডচিত্র। অপরাধীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে হলে প্রশাসনকে যেমন নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে, তেমনি জনপ্রতিনিধিদেরও ধৈর্যের সাথে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। একমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিকভাবে সচেতন অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমেই এই ধরনের অন্যায় পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করা সম্ভব।
লেখক: রাজনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক