ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহে বিসিআইসি সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সাথে জেলায় সর্বস্তরে চাঁদাবাজি, দখলবাজি বন্ধ এবং সার, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ৬ দফা দাবি তুলে ধরেছে দলটি।
আজ শুক্রবার ঝিনাইদহ জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন জেলা আমীর ও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর।
সংবাদ সম্মেলনে ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মতিয়ার রহমান, ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু তালিব, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মো. আলিমুজ্জামান ও অধ্যাপক আব্দুল হাই, ঝিনাইদহ সদর আমীর মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, মুহাদ্দিস মাওলানা মোঃ রবিউল ইসলাম এবং জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে জেলা আমীর বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে আত্মীয়তা, রাজনৈতিক পরিচয় ও আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাধারণ কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
বিভিন্ন উপজেলায় ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ: সংবাদ সম্মেলনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডিলারশিপ বণ্টনে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। অভিযোগ করা হয়—
-
কালীগঞ্জ: শিমলা-রোকনপুর ও ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপি সভাপতির আত্মীয়দের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।
-
মহেশপুর: শ্যামকুড়ে জেলা বিএনপির এক নেতার আত্মীয় ও উপজেলা যুবলীগ সভাপতির ভাইকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। যাদবপুরে বিএনপির উপজেলা নেতার আত্মীয় ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতাকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়। এছাড়া আজমপুরে নিয়মবহির্ভূতভাবে এক এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষক ডিলারশিপ পেয়েছেন।
-
হরিণাকুণ্ডু: বিভিন্ন ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের ভাই ও নিকটাত্মীয়দের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
-
সদর উপজেলা: নিজস্ব গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে বিএনপির এক সাংগঠনিক সম্পাদককে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতিষ্ঠানেও ডিলারশিপ বণ্টন করা হয়েছে।
জামায়াত নেতাদের দাবি, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্যদের বাদ দিয়ে দলীয় পরিচয়ে ডিলারশিপ দেওয়ায় জেলাজুড়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক বদলি, জেলা পরিষদের নিয়োগ ও হামলা-চাঁদাবাজির অভিযোগ: সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি কমিটিতে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। জেলা পরিষদের নিয়োগে জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও নির্যাতিতদের অবমূল্যায়ন করে কর্মকর্তাদের স্বজনদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা পরিষদের ‘সুইপার’ পদে হরিজন সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে মুসলিম যুবককে নিয়োগের বিষয়টি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও চাঁদাবাজির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডুতে জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে সরকারদলীয় লোকজন। অন্যদিকে, ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সড়কে ভ্যান ও ইজিবাইক থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলা হলেও জেলা প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সিক্স লেন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণেও চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়।
জামায়াতের ৬ দফা দাবি: ১. অনিয়ম ও অবৈধভাবে দেওয়া সব ডিলারশিপ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে হবে। ২. জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং এবং ডিলারশিপ বাছাই কমিটি পুনর্গঠন/বাতিল করতে হবে। ৩. টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ৪. অবিলম্বে সার, তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করতে হবে। ৫. প্রাথমিক শিক্ষক বদলি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সুপারিশ বা তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ৬. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ক্যাডার বাহিনীর তাণ্ডব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে আলী আজম মো. আবু বকর বলেন, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পরিচয়মুক্ত এক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা। কৃষক যেন সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পান এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন সর্বসাধারণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।