ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
৯ মাস ধরে ভেঙে পড়ে আছে ঝিনাইদহের ভবানীপুর সেতু: চরম জনদুর্ভোগে দুই ইউনিয়ন। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মহারাজপুর ও কুমড়াবাড়িয়া—এই দুই ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াতের প্রধান পথে এখন এক মরণফাঁদের নাম ভবানীপুর-ডেফলবাড়ী সেতু। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভেঙে পড়ে থাকলেও তা সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় জনদুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। ‘বিষয়খালী-নগরবাথান ভায়া ডেফলবাড়ী’ সড়কের এই জনগুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের খালের ওপর নির্মিত সেতুটি এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপ। আর এই ভাঙা সেতুর ওপর স্থানীয়দের তৈরি করা একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই এখন দুই ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষের পারাপারের একমাত্র ভরসা। তবে সেই সাঁকোটিও এখন এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। ৪৫ বছরের পুরনো জরাজীর্ণ সেতুটির মাঝখানের বড় একটি অংশ ভেঙে সরাসরি খালের পানিতে পড়ে আছে। রড আর পলেস্তারা খসে কঙ্কালসার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেতুর অবশিষ্টাংশ। স্থানীয়রা নিজেদের প্রয়োজনে এবং যোগাযোগ সচল রাখতে ভাঙা অংশের ওপর কয়েক জোড়া বাঁশ দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেছেন। সেই সাঁকো দিয়ে পার হওয়ার সময় দেখা যায় মানুষের নিদারুণ কষ্ট। কেউ সাইকেল মাথায় নিয়ে পার হচ্ছেন, কেউবা অসুস্থ রোগীকে কোলে করে পার করছেন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের জন্য এই সাঁকোটি যেন এক আতঙ্ক। স্থানীয় ডেফলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সজিব হোসেন জানায়, আগে আমরা খুব সহজে সাইকেল চালিয়ে এই সেতু দিয়ে স্কুলে যেতাম। কিন্তু গত বছর থেকে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এখন বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে গেলে পা কাঁপে। সাঁকোটি নড়বড় করে, মনে হয় এখনই পড়ে যাব। বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। আমরা চাই দ্রুত এখানে একটা ভালো সেতু হোক।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, এই সেতু ভেঙে পড়ায় সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন এলাকার কৃষিজীবী মানুষ। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার এই অঞ্চলটি মূলত সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কলা, পেঁপে ও মৌসুমি সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সেতুটি যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন শত শত কৃষক। কৃষক হোসেন আলী আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের এলাকায় প্রচুর সবজি হয়। আগে ভ্যান বা ট্রাক সরাসরি খেতে চলে আসত। এখন সেতু ভেঙে থাকায় কোনো গাড়ি আসতে চায় না। বাধ্য হয়ে আমাদের সবজি মাথায় করে বা অনেক পথ ঘুরে বাজারে নিতে হয়। এতে করে কুলি খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং সময়ও নষ্ট হচ্ছে। ফলে আমরা ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। অনেক সময় সবজি ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে। এই সেতুটি আমাদের পেটে লাথি মারার মতো অবস্থা তৈরি করেছে।
পরিবহন সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে অটোরিকশা চালক আল আমিনের কথায়। তিনি জানান, আগে বিষয়খালী থেকে নগরবাথান যেতে সময় লাগত মাত্র ২০ মিনিট। এখন সেতু ভাঙা থাকায় প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে তেলের খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি যাত্রীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত ভাড়া নিতে হচ্ছে। অনেক সময় জরুরি রোগী নিয়ে বিকল্প পথে যেতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় পার হয়ে যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী বা বয়স্ক রোগীদের জন্য এই এলাকাটি এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ ৯ মাস পার হয়ে গেলেও কেন সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে স্থানীয় মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা মকলেচুর রহমান বলেন, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে এলজিইডি অফিস পর্যন্ত সব জায়গায় জানিয়েছি। কর্মকর্তারা এসে ছবি তুলে নিয়ে গেছেন, মাপঝোকও করেছেন। কিন্তু এখনো কাজ শুরু হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। কবে এই দুর্ভোগ শেষ হবে, তা কেউ আমাদের বলতে পারছে না। আমাদের শুধু আশ্বাসের ওপরেই রাখা হচ্ছে। এলাকার মানুষ এখন ক্ষুব্ধ। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।
এলাকাবাসীর অভিযোগ এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবহুল। সড়কের এই পয়েন্টে মূলত দুটি সেতু ছিল, যার মধ্যে একটির অবস্থা কিছুটা ভালো থাকায় সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ভবানীপুর এলাকার এই পুরনো সেতুটি গেল বছরের অতিবৃষ্টি ও পানির প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। ইতোমধ্যে সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য পৃথক দুটি প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাজেট অনুমোদন এবং দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা টেন্ডার আহ্বান করব। আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা নির্মাণকাজ শুরু করতে পারব। তবে বরাদ্দ না আসা পর্যন্ত আমাদের হাত-পা বাধা।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, সেতুর বিষয়টি জেলা সমন্বয় সভায় একাধিকবার উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় ঝুলে আছে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য। খালের দুই পাড়ের মানুষ এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কারণ একটু বৃষ্টি হলেই খালের পানি বেড়ে যায় এবং বাঁশের সাঁকোটি তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এলাকার সচেতন মহলের দাবি, কেবল আশ্বাস নয়, বরং শুকনো মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই যেন সেতুর কাজ শুরু করা হয়। কারণ বর্ষা মৌসুমে খালের স্রোত বাড়লে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং তখন দুর্ভোগের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ঝিনাইদহের এই অবহেলিত জনপদটি এখন প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। একটি টেকসই সেতু কেবল যাতায়াত নয়, এই অঞ্চলের শিক্ষা ও অর্থনীতির চাকা সচল করার একমাত্র চাবিকাঠি।