৬ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২%: ঠিকাদারের খামখেয়ালিপনায় মরণফাঁদে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক

৬ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২%: ঠিকাদারের খামখেয়ালিপনায় মরণফাঁদে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক

বিশেষ প্রতিবেদক

৬ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২%: ঠিকাদারের খামখেয়ালিপনায় মরণফাঁদে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা কাটার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম অবহেলা ও খামখেয়ালিপনায় থমকে আছে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক (এন-৭) ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ। গত ছয় বছরে এই মেগা প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই শতাংশে। ফলে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় বেড়ে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। উল্টো দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা খুঁড়ে রাখায় পুরো মহাসড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশালাকার খানাখন্দ, যা এখন রূপ নিয়েছে নিত্যদিনের মরণফাঁদে।

আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ। তবে কাজের আশানুরূপ গতি না থাকায় প্রকল্পটিতে অধিকতর অর্থায়নে অনীহা প্রকাশ করেছে অর্থায়নকারী সংস্থা বিশ্বব্যাংক। ফলে নির্ধারিত সময়ে এই জনগুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের কাজ আদৌ শেষ হবে কিনা, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এক নজরে প্রকল্প ও বর্তমান সংকট

  • মূল অনুমোদিত ব্যয় (২০২০): ৪,১৮৭ কোটি টাকা

  • সংশোধিত বর্তমান ব্যয়: ৬,৬২৬ কোটি টাকা

  • বাস্তব অগ্রগতি: মাত্র ২% (প্রকৌশল সূত্রে ১০% দাবি)

  • বর্তমান অবস্থা: কালীগঞ্জ অংশে ৪৫% এবং ঝিনাইদহ সদর অংশে ৫০% ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন

  • প্রকল্পের মেয়াদ: আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে বর্ধিত মেয়াদ

  • অর্থায়ন পরিস্থিতি: জুলাই মাসে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনের পর অর্থায়ন স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত

ভূমি হস্তান্তর হলেও ‘কচ্ছপগতি’

প্রকল্পের গতি বাড়াতে জেলা প্রশাসন কালীগঞ্জ ও ঝিনাইদহ সদর এলাকার প্রায় ৫০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের ‘উইকেয়ার’ (WECARE) প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সরকারের ছয়টি বিভাগ যুক্ত থাকায় শুরুতে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হলেও বর্তমানে প্রশাসনের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

তবে মূল কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড এবং লট-১ এর দায়িত্বে থাকা ম্যাক্স ফার্মের স্থানীয় প্রতিনিধিদের চরম গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক সব বাধা দূর হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদাররা কাজ শুরু করতে গড়িমসি করছেন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুবীর কুমার দাশ জানান:

“আমাদের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণের কাজে কোনো গাফিলতি নেই। দ্রুততার সঙ্গেই কাজ এগোচ্ছে। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে জমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।”

কড়া নজরদারিতে বিশ্বব্যাংক, ঝুলে আছে অর্থায়ন

প্রকল্পের ধীরগতিতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। গত ১৯ জুলাই ঝিনাইদহে প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডাইরেক্টর জোঁ পেম এবং অপারেশন ম্যানেজার গেইল মার্টিন। পরিদর্শন শেষে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আগামী ডিসেম্বরে বর্তমান মেয়াদের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো বা অতিরিক্ত অর্থায়ন করা হবে কিনা—সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী পর্ষদ সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চরমে জনভোগান্তি: স্থবির রুট, ক্ষুব্ধ পরিবহন মালিকরা

ভোমরা, বেনাপোল স্থলবন্দর এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরের পণ্য খালাস করে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর একমাত্র প্রধান রুট এই ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক। কাজ ঝুলে থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের যন্ত্রাংশ।

ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবহন মালিক ওসমান গণি বলেন,

“জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ঠিকাদারের খামখেয়ালিপনায় পুরো রাস্তা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গর্তের কারণে গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে।”

দায় এড়ানোর চেষ্টা ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য

কাজের এমন কচ্ছপগতির বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

তবে লট-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী ধীরগতির কথা কিছুটা স্বীকার করে বলেন, “শুরুর দিকে জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে পারেনি। তবে মার্চ ও জুলাই মাসে আমরা নতুন জমি বুঝে পেয়েছি। বর্তমানে কাজের গতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকেই মহাসড়কের কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।”

অন্যদিকে লট-২ ও ৩ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন,

“প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণেই মূলত এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি নগণ্য। বারবার তাগিদ ও চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অসংলগ্ন বক্তব্য এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতায় ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এখন এক বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন রক্ষা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।

আরো পড়ুন
কালীগঞ্জে কালবৈশাখীর তাণ্ডব: গাছের ডালে পিষে গেল দোকান
আরো পড়ুন
মহেশপুরের মথুরা বিএডিসি খামারে দুর্নীতির মহোৎসব
আরো পড়ুন
পানিহীন জিকে সেচ খাল: পুড়ছে শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডুর ফসলি মাঠ
আরো পড়ুন
৯ মাস ধরে ভেঙে পড়ে আছে ঝিনাইদহের ভবানীপুর সেতু: চরম জনদুর্ভোগে দুই ইউনিয়ন
আরো পড়ুন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন: আইনমন্ত্রীর বক্তব্য ও বিভ্রান্তি নিরসন
আরো পড়ুন
WhatsApp Image 2026-04-11 at 7.17
আরো পড়ুন
Scroll to Top