বিশেষ প্রতিবেদক
ঝিনাইদহে আত্মহত্যায় ১০ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজারের বেশি, চলতি ৬ মাসেই ১৮৯ জনের মৃত্যু। ফলে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রকাশনা, জেলা পুলিশ সুপারের দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেক্টিভ (আরডিসি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম এই জেলা। সামান্য তুচ্ছ ঘটনা, পারিবারিক কলহ কিংবা ক্ষণিকের অভিমান ঘিরে জেলাটিতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে অপমৃত্যুর দীর্ঘ তালিকা।
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ৯ বছরেই ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন এবং বিষপানসহ নানাভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন ২২,০৬৭ জন। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই ধারা একইভাবে অব্যাহত রয়েছে।
-
গত চার বছরের তথ্য (২০২২-২০২৫): ২০২২ সালে ৩২৩ জন, ২০২৩ সালে ৩২৮ জন, ২০২৪ সালে ৩১৯ জন (১৫২ পুরুষ, ১৬৭ নারী) এবং ২০২৫ সালে ৩০১ জন (১৩৩ পুরুষ, ১৬৮ নারী) আত্মহত্যা করেন। চার বছরে মোট ১,২৭১ জন আত্মহননের পথ বেছে নেন।
-
চলতি বছরের চিত্র (২০২৬): ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসেই জেলায় মোট ১৮৯ জন (৯২ পুরুষ, ৯৭ নারী) প্রাণ হারিয়েছেন—যা গত বছরের একই সময়ের (১২৫ জন) তুলনায় প্রায় ৫১% বেশি।
-
উপজেলাভিত্তিক হার: চলতি বছরের ৬ মাসে আত্মহত্যার শীর্ষে রয়েছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা (৫৯ জন)। এছাড়া শৈলকুপায় ৪৪, হরিণাকুন্ডুতে ২৫, কোটচাঁদপুরে ২১, কালীগঞ্জে ২০ এবং মহেশপুরে ২০ জন আত্মহত্যা করেছেন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামের আবুল হোসেনের পরিবারের ঘটনাটি আত্মহত্যার ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তোলে। বাবার পকেট থেকে টাকা নেওয়ায় বাবার বকুনি খেয়ে ছোট ছেলে ইসলাম, ঈদের দিন ঝগড়া করে মায়ের বকুনি খেয়ে বোন আকলিমা এবং পারিবারিক কলহের জেরে বড় ভাই মসলেম হোসেনের স্ত্রী বুড়ি বিবি কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করেন। আরেক ভাই মতিয়ার বোতলে রাখা কীটনাশককে মধু ভেবে খেয়ে মারা যান। সন্তানের শোক সইতে না পেরে পরবর্তীতে মারা যান বাবা-মাও।
জীবিত ভাই মসলেম হোসেন আকুতি জানিয়ে বলেন, “আত্মহত্যায় আমাদের পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। পৈতৃক ভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে এসেছি। কোনো কিছুর সমাধান আত্মহত্যা হতে পারে না, কেউ যেন এই ভুল পথ বেছে না নেন।”
হতাশা থেকে বিষপান করে চিকিৎসায় বেঁচে ফেরা কামারকুণ্ডু গ্রামের সোবহান মোল্লা জানান, গার্মেন্টসের চাকরি হারিয়ে বেকারত্বের হতাশায় তিনি বিষপান করেছিলেন। এখন তিনি ভুল বুঝতে পেরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে স্বস্তি প্রকাশ করছেন।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা ‘সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাক্টিভিটিস’ (শোভা)-এর নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের মানুষের রাগ-অভিমান প্রকাশের প্রবণতা বেশি। কৃষিপ্রধান অঞ্চল হওয়ায় ঘরে ঘরে কীটনাশকের সহজলভ্যতা, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা ও মানসিক সহনশীলতার অভাব প্রধান কারণ। এছাড়া ভৌগোলিক কারণে অঞ্চলটি প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত হওয়ায় মানুষের সহ্যক্ষমতা তুলনামূলক কম গড়ে ওঠে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তপন কুমার রায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন। ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন এবং পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান জানান, পুলিশ ও প্রশাসন আইনি নজরদারির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় নাটক মঞ্চায়ন ও সুশীল সমাজকে সঙ্গে নিয়ে উঠান বৈঠক পরিচালনা করছে।