অস্ত্রের ঝংকার ও বহিরাগতদের ছায়ায় বদলে যাওয়া দেশে অভিন্ন তাণ্ডবে নতুন বাংলাদেশ কি পুরোনো রাজনীতিতেই ফিরছে

বদলে যাওয়া দেশে অভিন্ন তাণ্ডব

শেখ জিল্লুর রহমান

অস্ত্রের ঝংকার ও বহিরাগতদের ছায়ায় বদলে যাওয়া দেশে অভিন্ন তাণ্ডবে নতুন বাংলাদেশ কি পুরোনো রাজনীতিতেই ফিরছে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনগুলোকে সহিংসতা, দখলদারিত্ব, টর্চার সেল এবং বহিরাগতদের পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল দেশের মানুষ। কিন্তু সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) এবং রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সেই প্রত্যাশার মুখে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বেরোবিতে ছাত্রদলের ব্যানারে যুব ও বহিরাগতদের দেশীয় অস্ত্রের মহড়া এবং ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীদের মিছিলে অছাত্র ও যুবদল নেতাদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি—গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে যার সচিত্র প্রমাণ মিলেছে—শিক্ষাঙ্গনে আবারও এক পুরোনো ও বিষাক্ত সংস্কৃতির ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) যে ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক বিষয় নয় বরং এটি পরিকল্পিত দখলদারিত্বের এক স্পষ্ট নজির। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে একদল যুবক।

ভিডিও চিত্রে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়, রামদা, চায়নিজ রড, চাপাতি ও লাঠিসোটা হাতে নিয়ে যারা ক্যাম্পাসে আতঙ্ক সৃষ্টি করছিল, তাদের সিংহভাগই তরুণ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র নয়। স্থানীয় খোঁজখবর ও মূলধারার সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই বহিরাগতদের একটি বড় অংশই স্থানীয় যুবদল এবং অঙ্গসংগঠনের অছাত্র ক্যাডার। তারা ছাত্রদলের একটি পক্ষের ব্যানারে ক্যাম্পাসে ঢুকে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়। ভিডিও ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয় হলের আশপাশে এবং প্রধান ফটকের কাছে তাদেরকে অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করতে ও আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করতে দেখা গেছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ নিজের বুক পেতে দিয়ে বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, সেই একই চত্বরে অস্ত্রহাতে বহিরাগতদের এমন তাণ্ডব কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং শহীদের আত্মত্যাগের প্রতিও চরম অবমাননা প্রদর্শন করে।

বেরোবির ঘটনাটি যখন পুরো দেশকে হতবাক করেছে, ঠিক একই সময়ে ঢাকাতেও প্রায় অনুরূপ একটি চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজপথের মিছিলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুবদলের অছাত্র ও প্রবীণ নেতাদের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও এবং ভাইরাল ক্লিপগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ব্যানার ও ফেস্টুনের পেছনে কিংবা একেবারে সামনের কাতারে এমন বহু মুখ উপস্থিত ছিল, যাদের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে অন্তত এক থেকে দেড় দশক আগে।

ঢাকার রাজপথে চলা নানা কর্মসূচি ও শোডাউনের একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে এসব প্রবীণ অছাত্র ও যুবদল নেতারা কীভাবে কলকাঠি নাড়ছেন। মিছিলে স্লোগান দেওয়া থেকে শুরু করে নেতৃত্বদানকারী পোজ দেওয়া—সবখানেই তাদের দৃশ্যমান প্রাধান্য। সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যখন একটি নতুন, দখলদারিত্বহীন এবং ক্যাডারমুক্ত ছাত্ররাজনীতির দিকে এগোতে চাইছে, তখন দলের অভ্যন্তরের অছাত্র ও যুবদলের একটি গোষ্ঠী পুরোনো আমলের ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ বা বড় ভাই সংস্কৃতির পুনর্বাসন ঘটাতে তৎপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ কিংবা জাতীয় প্রেস ক্লাব ও পল্টন মোড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যানারে এসব অছাত্র নেতাদের উপস্থিতি মূলত প্রমাণ করে যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ক্ষমতা এখনো অছাত্রদের হাতেই বন্দী রাখার চক্রান্ত চলছে।

গত দেড় দশকে তৎকালীন শাসকদল ছাত্রলীগের ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি, হলে হলে টর্চার সেল, জোরপূর্বক মিছিলে নেওয়া এবং সিট বাণিজ্যের কারণে ছাত্ররাজনীতি সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশা করেছিল, দলীয় লেজুড়বৃত্তি এবং অস্ত্রনির্ভর রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হবে। কিন্তু বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেনি।

ছাত্রদলের ব্যানারে বহিরাগত যুবদল কর্মীদের ব্যবহার করার এই প্রবণতা মূলত একধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব নির্দেশ করে। যখন একটি ছাত্রসংগঠন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে বা সংগঠনে মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা রাজপথে ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বজায় রাখতে বহিরাগত পেশিশক্তি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এই ধরনের অস্ত্রের মহড়া এবং অছাত্রদের প্রবেশের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, দফায় দফায় চলা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অস্ত্রের মহড়ার সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে দিকবিদিক ছুটাছুটি করছেন, ক্লাস-পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে এবং আবাসিক হলগুলোতে আবারও এক অজানা আতঙ্কের ছায়া নেমে আসছে।

এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা চরম হতাশাজনক। গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন ও ভিডিও প্রমাণ থাকার পরও তাৎক্ষণিকভাবে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের ব্যর্থতা বা শিথিলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ক্যাম্পাস কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সম্পত্তি বা বহিরাগত ক্যাডারদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়। তাই বহিরাগত ও অছাত্রদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ছিল, যা তারা পালনে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে।

শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা এবং অছাত্রদের রাজনীতি বন্ধে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া ব্যতিরেকে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে। পরিচয়পত্র ছাড়া বিশ্ববিদ্যালযের অভ্যন্তরে এবং আবাসিক হলগুলোতে কারও প্রবেশাধিকার থাকা যাবে না। বেরোবি এবং ঢাকার ঘটনায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো যাচাই-বাছাই করে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দোষীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলকে অবিলম্বে তাদের কাঠামোর ভেতর শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। যেসব অছাত্র ও যুবদল কর্মী ছাত্রদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে বা অস্ত্র হাতে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। লেজুড়ভিত্তিক ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প হিসেবে ডাকসু, জাকসু, রাকসুর মতো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও অতি দ্রুত নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করতে হবে, যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব মেধাভিত্তিক প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৯০ এবং ২০২৪-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সবখানেই ছাত্ররাই ছিল অগ্রসেনানী। কিন্তু এই ত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাসকে লাঞ্ছিত করছে আজকের ক্যাডারভিত্তিক, অস্ত্রনির্ভর ও অছাত্রকেন্দ্রিক রাজনীতি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকায় গত কয়েকদিনে প্রচারিত ভিডিওচিত্রগুলো আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা জারি করেছে। শিক্ষাঙ্গনকে যদি ক্যাডার ও বহিরাগতদের আখড়া হতে দেওয়া হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের সব অর্জন ও শহীদদের আত্মত্যাগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার—তারা কি নতুন যুগের মেধাভিত্তিক রাজনীতি চায়, নাকি পুরোনো দিনের পেশিশক্তি ও অস্ত্রের ঝংকার অব্যাহত রাখতে চায়। সহাবস্থান, জ্ঞানচর্চা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার রাজনীতিই হতে পারে এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।

লেখক: সাংবাদিক  ও প্রাবন্ধিক

আরো পড়ুন
যশোরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ব্যবচ্ছেদ: রাজনৈতিক সমীকরণ, 'মব কালচার' ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেন্জ
আরো পড়ুন
Screenshot 2026-03-11 130203
আরো পড়ুন
তারেক রহমানের ফিরতে বাধা কোথায়?
আরো পড়ুন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: খুলনা বিভাগে ইসলামী জোট এবং বিএনপির আসন সম্ভাবনা
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা
আরো পড়ুন
এবার নদী ও খাল সংস্কার করাই হোক ঝিনাইদহের নির্বাচনী ইশতেহার
আরো পড়ুন
Scroll to Top