মহেশপুরের মথুরা বিএডিসি খামারে দুর্নীতির মহোৎসব

মথুরা বিএডিসি খামারে দুর্নীতির মহোৎসব: নিম্নমানের সামগ্রীতেই উঠছে সীমানাপ্রাচীর!

মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি

মথুরা বিএডিসি খামারে দুর্নীতির মহোৎসব: নিম্নমানের সামগ্রীতেই উঠছে সীমানাপ্রাচীর! ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মথুরা বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন) খামারের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বিশাল অংকের বাজেটে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খামখেয়ালিপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতায় স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার পান্তাপাড়া ইউনিয়নের মথুরা কৃষি খামারের ৫৭৫ মিটার দৈর্ঘ্যর এই সীমানাপ্রাচীরটি দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে যেভাবে কাজ চলছে, তাতে এর স্থায়িত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংশয়। স্থানীয়দের দাবি, শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সিডিউলের তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত নিম্নমানের ইট, বালু, পাথর ও রড ব্যবহার করে আসছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার প্রতিবাদ জানালেও কাজের মান উন্নত না করে উল্টো তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সরেজমিনে মথুরা কৃষি খামারে গিয়ে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য যে ইটগুলো সাইটে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, তার সিংহভাগই দুই নম্বর ও তিন নম্বর গ্রেডের। পোড়ামাটির এসব ইট হাত দিয়ে আঘাত করলেই গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী সীমানাপ্রাচীর বা যেকোনো সরকারি অবকাঠামোতে এক নম্বর গ্রেডের ঝামা ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও এখানে প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী। কেবল ইট নয়, ঢালাইয়ের কাজে যে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে কাদার পরিমাণ অনেক বেশি। এছাড়া রড ও সিমেন্টের মিশ্রণের ক্ষেত্রেও সিডিউলের মানদণ্ড মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসতিয়াক কনস্ট্রাকশন এই ৫৭৫ মিটার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করছে। কাজ শুরুর পর থেকেই স্থানীয় সাধারণ মানুষ নিম্নমানের সামগ্রী দেখে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের দাপট ও প্রভাবের কাছে স্থানীয়দের বাধা কোনো কাজে আসছে না। পান্তাপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা এই এলাকাতেই থাকি, আমাদের চোখের সামনে সরকারি টাকা নয়ছয় হচ্ছে। অথচ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছি না। নিম্নমানের ইট দিয়ে গাঁথুনি দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে কয়দিন পর দেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিএডিসির মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কাজে এমন দুর্নীতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

অভিযোগ রয়েছে যে, নিম্নমানের কাজ হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। স্থানীয়দের মতে, প্রকৌশলী বা তদারকি কর্মকর্তাদের সাইটে খুব একটা দেখা মেলে না। আর এই সুযোগটিই পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সংবাদকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরতরা চতুরতার আশ্রয় নেন। প্রথম দফায় নিম্নমানের সামগ্রীর কথা স্বীকার করে তা সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। কয়েক দিন বিরতি দিয়ে আবারও সেই একই ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ইটের গাঁথুনি দিয়েই দেয়াল তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত ম্যানেজার রেজা হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, ইটের মান কিছুটা খারাপ এবং বালুতে ময়লা আছে। তবে তিনি দায়সারাভাবে জানান, এসব মালামাল সাইট থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র; সরিয়ে নেওয়ার বদলে সেই সব নিম্নমানের সামগ্রীই ইতোমধ্যে দেয়ালে গেঁথে ফেলা হয়েছে।

সরকারি কাজে এমন স্বচ্ছতাহীনতা ও দুর্নীতির বিষয়ে বিএডিসির প্রকৌশলী মো. মামুনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, তিনি মথুরা ফার্মের কাজ পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে কাজের সাইটে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ওইসব খারাপ ইট সরিয়ে ফেলার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে প্রকৌশলীর এই নির্দেশের পরও মাঠ পর্যায়ে কাজের মানের কোনো পরিবর্তন না আসায় জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে যে, নেপথ্যে কোনো যোগসাজশ আছে কি না। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল ইট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেই দায় শেষ হয় না; ইতোমধ্যে যে পরিমাণ নিম্নমানের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে, তা ভেঙে ফেলে নতুন করে কাজ শুরু করা প্রয়োজন। কারণ সীমানাপ্রাচীরটি খামারের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি একবার দুর্বল প্রাচীর তৈরি হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে তা যেমন সরকারি অর্থের অপচয় ঘটাবে, তেমনি খামারের নিরাপত্তা ও সম্পদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।

বর্তমানে মথুরা বিএডিসি খামারের এই প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে মহেশপুর উপজেলার সর্বত্র আলোচনার ঝড় বইছে। এলাকাবাসী মনে করছেন, এই প্রকল্পে যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হয় এবং দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। তারা দ্রুত জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে প্রকল্পের কাজ পুনরায় সিডিউল অনুযায়ী উন্নত সামগ্রী দিয়ে শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। ঝিনাইদহের এই সীমান্ত এলাকায় কৃষি খামারের উন্নয়নে সরকারের যে সদিচ্ছা, তা একশ্রেণির অসাধু ঠিকাদার ও তদারকি কর্মকর্তার উদাসীনতায় ভেস্তে যেতে বসেছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত বিএডিসি কর্তৃপক্ষ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় নাকি এই নিচু মানের কাজই সরকারি খাতা কলমে পাস হয়ে যায়। এলাকার বাসিন্দারা এখন ঊর্ধ্বতন মহলের একটি সাহসী ও সৎ পদক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

আরো পড়ুন
পানিহীন জিকে সেচ খাল: পুড়ছে শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডুর ফসলি মাঠ
আরো পড়ুন
৯ মাস ধরে ভেঙে পড়ে আছে ঝিনাইদহের ভবানীপুর সেতু: চরম জনদুর্ভোগে দুই ইউনিয়ন
আরো পড়ুন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন: আইনমন্ত্রীর বক্তব্য ও বিভ্রান্তি নিরসন
আরো পড়ুন
WhatsApp Image 2026-04-11 at 7.17
আরো পড়ুন
555
আরো পড়ুন
WhatsApp Image 2026-04-11 at 12.20
আরো পড়ুন
Scroll to Top