তেলের মাপে কম দেওয়ার প্রতিবাদ কি তবে মৃত্যুর পরোয়ানা?

শেখ জিল্লুর রহমান

ঝিনাইদহ শহর আজ এক অশান্ত ও শোকাতুর জনপদ। যে শহরটি শান্ত ও সম্প্রীতির জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এক তুচ্ছ ঘটনার জেরে ঝরে গেল তরতাজা একটি প্রাণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারির যোদ্ধা নীরব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক চরম বহিঃপ্রকাশ। ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের জ্বালানি তেলের মাপে কম দেওয়ার প্রতিবাদ করায় একজন মানুষকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। এই নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য আজ কতটুকু সস্তা হয়ে পড়েছে।

নীরব হোসেনের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শনিবার রাত থেকে ঝিনাইদহ শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আরাপপুর এলাকার সৃজনী ফিলিং স্টেশন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি ও ইউনিলিভার ডিপোতে হামলার ঘটনা জনরোষের তীব্রতাকেই তুলে ধরে। তবে প্রশ্ন ওঠে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। পুলিশের উপস্থিতিতেই যখন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও শহরের জনমনে যে আগুনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তা নেভানো সহজ নয়।

সবচেয়ে বিতর্কিত মোড় নিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাতজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের ঘটনা। ডিবি পুলিশের দাবি অনুযায়ী, বাস টার্মিনালে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ আন্দোলনকারী ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। নীরবের হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। যদি প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে আন্দোলনের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাঝপথে এ ধরনের গ্রেফতার পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

ঝিনাইদহ এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে একটি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড ও ধরপাকড়—সব মিলিয়ে শহরজুড়ে থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আমরা মনে করি, ন্যায়বিচারের দাবি কখনো সহিংসতা দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়, আবার সহিংসতা দমনের নামে নিরপরাধ কাউকে বলির পাঁঠা বানানোও কাম্য নয়। প্রশাসনকে স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত করে বের করতে হবে যে, তেলের পাম্পের এই বিরোধের নেপথ্যে কারা ছিল এবং রাতে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কাদের হাত রয়েছে।

পরিশেষে, নীরব হোসেনের মতো একজন লড়াকু তরুণের রক্ত যেন ঝিনাইদহের রাজপথে বৃথা না যায়। প্রকৃত খুনিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে, কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে যেন নিরপরাধ ছাত্রনেতারা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি। ঝিনাইদহ শহরে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

আরো পড়ুন
অস্ত্রের ঝংকার ও বহিরাগতদের ছায়ায় বদলে যাওয়া দেশে অভিন্ন তাণ্ডবে নতুন বাংলাদেশ কি পুরোনো রাজনীতিতেই ফিরছে
আরো পড়ুন
যশোরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ব্যবচ্ছেদ: রাজনৈতিক সমীকরণ, 'মব কালচার' ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেন্জ
আরো পড়ুন
তারেক রহমানের ফিরতে বাধা কোথায়?
আরো পড়ুন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: খুলনা বিভাগে ইসলামী জোট এবং বিএনপির আসন সম্ভাবনা
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা
আরো পড়ুন
এবার নদী ও খাল সংস্কার করাই হোক ঝিনাইদহের নির্বাচনী ইশতেহার
আরো পড়ুন
Scroll to Top