শুধুই কি তেলের দাম বাড়ল?

শুধুই কি তেলের দাম বাড়ল?

বিশেষ প্রতিনিধি

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

‘বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। তার পরও সরকার গভীর রাতে হঠাৎ করে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এটি মোটেই ঠিক কাজ করেনি। কারণ এর প্রভাবে সস্তা আলুর দামও বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি ট্রাকে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ২-৩ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। তাহলে মানুষ খাবে কী? টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। দেশে হাহাকার পড়ে যাবে।’ রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি আলু ব্যবসায়ী মো. সবুজ ব্যাপারী তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া এভাবেই ক্ষোভের সঙ্গে তুলে ধরেন।

শুধু এই ব্যবসায়ীই নন, বিভিন্ন বাজারের আড়তদার, খুচরা ব্যবসায়ী, পরিবহন চালক, কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মারাত্মক ক্ষুব্ধ। সবার একই অভিযোগ—সব পণ্যের বাজার এমনিতেই চড়া, তার ওপর আবার তেলের দাম বাড়ানো হলো। এতে বাজারে চরম নৈরাজ্য তৈরি হবে এবং যার যার মতো দাম আদায় করবে। গত এপ্রিল থেকে শুরু করে ছয় মাসের মধ্যে তিনবার তেলের দাম বাড়ানো হলো।

কারওয়ান বাজারে টিসিবি ভবনের কাছে প্রাইভেট কারের চালক আল-আমিন বলেন, ‘দেশে কী হলো যে এক লাফেই পেট্রল, অকটেন, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়াল সরকার? এর আগেও জুনে বাড়ায়, তার আগে এপ্রিলে বাড়ায়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর হয়নি, কিন্তু তিনবার তেলের দাম বাড়ানো হলো। আমাদের বেতন তো বাড়ে না। যারা কোটিপতি বা বড় অফিসার তাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমরা যারা ছোট চাকরি করি বা দিনমজুর, তাদের কী হবে? তা না হলে দেশে হাহাকার পড়ে যাবে।’

বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. এমরান মাস্টার জানান, অতিবৃষ্টি ও বর্ষার কারণে বর্তমানে সবজির দাম চড়া। তেলের দাম বাড়ায় এর দাম আরও বাড়বে। যশোর থেকে আসা ট্রাক ভাড়া বাড়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ানোর বাড়তি টাকা ট্রাক মালিক তো লোকসান করে পকেট থেকে দেবে না। এর প্রভাব ভোক্তাদের ঘাড়ে পড়বে। বাজারে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে।’ যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরেও স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন। গণপরিবহন, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি, মাছ ও পোলট্রি, শিল্প-কারখানা, নির্মাণ খাত, এমনকি ই-কমার্স ও চিকিৎসাসেবাতেও এই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

উত্তরার শেখ জাহাঙ্গীর আলম পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেলে তেল কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১০ লিটার তেলে তার ২০০ টাকা বেশি চলে গেল। বাজার করতে গেলেও বিক্রেতারা তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দিচ্ছেন। মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ী মেসার্স সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, কোম্পানি থেকে তাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হলেও কোম্পানি বাড়তি জ্বালানি খরচ লোকসান করবে না; সেই বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চড়বে। হাতিরপুল বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. মাসুদসহ অন্য বিক্রেতারা জানান, কিছুদিন আগেই আটা, সাবানসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন তেলের দাম বাড়ায় সব জিনিসের দাম নতুন করে বাড়বে, আর বদনাম ও গালি শুনতে হবে খুচরা বিক্রেতাদের।

তবে সরকারি পক্ষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ে। ফলে দেশে জ্বালানিসংকট দেখা দিলে মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নতুন গেজেট অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, অকটেন ১৬৫ এবং পেট্রল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় ১৮ এপ্রিল প্রথম দফায় ডিজেল ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা করে। এরপর জুনে দ্বিতীয় দফায় কেরোসিন ১৩৫, পেট্রল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা করা হয় (তখন ডিজেল অপরিবর্তিত ছিল)। সার্বিকভাবে গত ছয় মাসে তিন দফায় লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা, অকটেন ৪৫ টাকা, পেট্রল ৪৪ টাকা এবং কেরোসিন ৪৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্যে রাজি না হলেও মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বিশ্ববাজারের চড়া মূল্যের কারণে ডিজেলে লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল, যার দৈনিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। ফলে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর মাধ্যমে বছরে বিপিসির প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে।

এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, সরকার আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, এখন তেলের দাম বাড়াল, সামনে হয়তো গ্যাসের দাম বাড়াবে। এতে মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় এই দাম বাড়ানো হচ্ছে এবং অপচয়-দুর্নীতি বন্ধ না করে ভর্তুকি কমাতে জ্বালানি খাতকে সরকারের সামর্থ্যের সংকটের শিকারে পরিণত করা হচ্ছে।

সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ফলে বাজারে যে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি হচ্ছে, এই দুইয়ের সম্মিলিত চাপে মূল্যস্ফীতি আবারও দুই অঙ্কের ঘরে চলে যাবে।

তিনি বিশ্লেষণ করে জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির স্পাইরাল ইফেক্ট দেশের পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করবে:

দ্বিমুখী মূল্যস্ফীতি: হঠাৎ লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ধরনের মূল্যস্ফীতি বাড়বে। একই সঙ্গে পে- কমিশনের কারণে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বাজারে অতিরিক্ত প্রবেশ করবে, যা মূল্যস্ফীতিতে চরম দ্বি-মুখী চাপ তৈরি করবে।

কৃষিতে সুদূরপ্রসারী ক্ষতি: সেচকাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ, ট্রাক্টর ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। সামনে ধান ও শাকসবজিসহ যেসব ফসল উৎপাদিত হয়ে বাজারে আসবে, তার উৎপাদন ও পরিবহন উভয় খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে কৃষিপণ্যের দাম অনেক বেশি থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অভাব: হঠাৎ সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাজারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতিতে যাওয়া উচিত। পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা না থাকলে জনগণ, শিল্প ও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতির কোনো সুযোগ পান না।

উৎপাদন, পরিবহন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে এই মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব ছড়াতে শুরু করেছে। পেট্রলপাম্পের লিটারপ্রতি বাড়তি টাকার হিসাব ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয়েছে দেশের সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষের বেঁচে থাকার চরম জীবনসংকটে।

আরো পড়ুন
3529f1af 0b33 4c85 92e6 5b2a1ab3fb2f 2ad5fa.og Image Dabc37
আরো পড়ুন
E0a686e0a6aee0a6bee0a6b0e0a6a6e0a787e0a6b6 Ff6885.og Image C25f41
আরো পড়ুন
87997c54 F3fd 4ad5 A621 64d0a508bf37 7f6d42.og Image 22f2f3
আরো পড়ুন
Db Harun
আরো পড়ুন
Business Thumbnail
আরো পড়ুন
Bank
আরো পড়ুন
Scroll to Top