Officer Greets Cheering Crowd

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: ইতিহাসের শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রত্যাশা

সম্পাদকীয়

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

আজ ৭ নভেম্বর। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। দিনটির তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে ফিরে তাকাতে হয় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার দিকে।

বিপ্লব বলতে কেবল সশস্ত্র অভ্যুত্থান, রক্তপাত কিংবা কোনো সরকারের পতনকে বোঝায় না। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ক্ষমতার কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনও বিপ্লবের অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, ইনসাফ, আমানতদারিতা, মানবিক মর্যাদা এবং জুলুম-অবিচারের অবসান। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি একটি আমানত। এ আমানতের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা শাসকের দায়িত্ব।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত ৫৮)।

ইসলামের এই মৌলিক শিক্ষা থেকে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জুলুম, দুর্নীতি, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেও এমন বাস্তবতা কাজ করেছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। মানুষের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ৩০০ আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সেসব অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে।

এরপর ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। অনাহার, দারিদ্র্য ও প্রাণহানির পাশাপাশি দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের মধ্য দিয়ে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। চারটি সংবাদপত্র ছাড়া অন্য সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার, ন্যায়বিচার ও পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘তাদের কার্যাবলি নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত ৩৮)। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় একক কর্তৃত্বের পরিবর্তে পরামর্শ, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এরপর রাষ্ট্রক্ষমতা ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে একের পর এক পালাবদল শুরু হয়। দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তা।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এ সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। তাদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের একটি অংশও রাজপথে অংশ নেয়। এ ঘটনাই পরবর্তী সময়ে সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, জাতীয়তাবাদী আদর্শের বিকাশ এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে ওঠে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এ ধারণায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী সব ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সম্প্রদায়ের মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করার কথা বলা হয়। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিষয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে গুরুত্ব পায়।

ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর। ইসলামে শাসক ও শাসিত উভয়ের জন্যই দায়িত্বশীলতার শিক্ষা রয়েছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তির কাছে জনগণের অধিকার একটি আমানত। সেই আমানতের খেয়ানত করা ইসলামের নীতির পরিপন্থী।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য ন্যায়সংগত সাক্ষ্য দাও।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৮)। এই নির্দেশনা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন রয়েছে। তবে দিনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের সঙ্গে যুক্ত। এ দিবসের শিক্ষা হওয়া উচিত—কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও কল্যাণকে উপেক্ষা করে কোনো শাসনব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না।

আজ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে অতীতের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ইতিহাসের কোনো একটি অধ্যায়কে কেবল রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে নয়, বরং নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের ন্যায়নীতি, আমানতদারিতা, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ধারণ করতে হবে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, জাতীয় ঐক্য ও স্বনির্ভরতার ভাবনা থেকে ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে প্রত্যাশা—বাংলাদেশে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচার বড় হবে, প্রতিহিংসার চেয়ে ক্ষমা ও সহনশীলতা গুরুত্ব পাবে, দুর্নীতির পরিবর্তে আমানতদারিতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শাসক-শাসিত সবাই আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনাকে ধারণ করে দায়িত্ব পালন করবে।

ইসলামের ন্যায়নীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণরাষ্ট্র। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন:

আরো পড়ুন
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী
আরো পড়ুন
Nationallaborforce 50cf30 720x405 1
1 29c3b0
আরো পড়ুন
Bangladesh Bank Jporman
আরো পড়ুন
Ontora Tati
আরো পড়ুন
Airport 1
আরো পড়ুন
Scroll to Top