সিয়াম নিছক উপবাস নয়, তাকওয়ার প্রশিক্ষণ

সিয়াম নিছক উপবাস নয়, তাকওয়ার প্রশিক্ষণ

শেখ জিল্লুর রহমান

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

সিয়াম নিছক উপবাস নয়, তাকওয়ার প্রশিক্ষণ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে নামাযের পরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত হলো রমযান মাসের রোযা। এটি কেবল উম্মাতে মুহাম্মাদীর ওপরই নয় বরং পূর্ববর্তী সকল নবীর শরীয়াতেও ফরয ছিল। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া (পরহেযগারী) অবলম্বন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা, ১৮৩)। এই আয়াতটিই রোযার মূল দর্শন ও এর বিশ্বজনীনতার প্রমাণ দেয়। তবে বর্তমানে আমাদের সমাজে রোযা রাখার যে প্রথা প্রচলিত, তার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আমরা অনেকেই এর বাহ্যিক কাঠামোকে আঁকড়ে ধরলেও এর মূল প্রাণশক্তি বা উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছি।

ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের সমগ্র জীবনকে ইবাদাতে পরিণত করা। ইবাদাত মানে কেবল নামাযের মুসাল্লায় বসে থাকা বা নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকা নয়; বরং চিন্তায় ও কর্মে প্রতিনিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধান করাই হলো প্রকৃত বন্দেগী। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি অনেক সময় তাকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। এই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর অনুগত দাসে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী প্রশিক্ষণের। রোযা হলো সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের নাম।

রোযার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর গোপনীয়তা। নামায, হজ্জ বা যাকাত—সবই লোকচক্ষুর সামনে আদায় করা যায়, কিন্তু রোযা এমন এক ইবাদাত যা কেবল আল্লাহ এবং বান্দাই জানেন। প্রচণ্ড গরমে পিপাসায় ছাতি ফেটে গেলেও বা ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হলেও একজন রোযাদার গোপনে এক ফোঁটা পানি পান করেন না। কেন? কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, দুনিয়ার কেউ না দেখলেও ‘আলেমুল গায়েব’ বা অদৃশ্যের জ্ঞাতা আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই যে আল্লাহর উপস্থিতির সচেতনতা, এটাই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ। প্রতি বছর এক মাস ব্যাপী এই নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলনের মাধ্যমে মুমিনের মনে আল্লাহর ভয় ও পরকালীন জবাবদিহিতার চেতনা শাণিত হয়।

প্রশিক্ষণ বনাম যান্ত্রিকতা

রোযা কেবল উপবাসের নাম নয়। যদি কোনো ব্যক্তি রোযা রেখে মিথ্যা কথা বলে, গীবত করে, ওজনে কম দেয় কিংবা অন্যের হক নষ্ট করে, তবে তার রোযা কেবল ‘উপবাস’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারি, ১৯০৩)

ভাত খাওয়ার উদ্দেশ্য যেমন বেঁচে থাকা এবং শক্তি অর্জন করা, তেমনি রোযার উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা চারিত্রিক দৃঢ়তা অর্জন। যদি কেউ ভাত খেয়ে সাথে সাথেই বমি করে ফেলে, তবে সে যেমন পুষ্টি পায় না; ঠিক তেমনি ইফতারের পর যদি কেউ আবার পাপে লিপ্ত হয়, তবে তার সারাদিনের সিয়ামের প্রভাব বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে রোযার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার প্রধান কারণ হলো, আমরা রোজাকে কেবল একটি বাৎসরিক প্রথা বা বাহ্যিক অনুষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করেছি, জীবন পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নয়।

আত্মসংযম ও ‘খুদী’র বিজয়

মানুষের তিনটি প্রধান জৈবিক চাহিদা—ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং যৌনপ্রবৃত্তি। এই তিনটির লাগাম যখন মানুষের ‘খুদী’ বা বিবেকের হাত থেকে ফসকে যায়, তখন মানুষ পশুর চেয়েও অধম হয়ে পড়ে। রোযা মানুষকে শেখায় কীভাবে নিজের নফসের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে হয়। এটি মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে এত মজবুত করে যে, সে কেবল আল্লাহর আদেশ পালন করার জন্য নিজের বৈধ চাহিদাগুলোকেও বিসর্জন দিতে শেখে। এই আত্মসংযম তাকে পরবর্তী ১১ মাস অন্যায় লোভ ও অবৈধ লালসা থেকে দূরে থাকার শক্তি যোগায়। তার প্রমাণ এই ‘হাদিসে কুদসি’: আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সিয়াম ঢাল স্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মত কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুই বার বলে, আমি সওম পালন করছি। ঐ সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই সওম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের সুগন্ধির চাইতেও উৎকৃষ্ট, সে আমার জন্য আহার, পান ও কামাচার পরিত্যাগ করে। সিয়াম আমারই জন্য। তাই এর পুরস্কার আমি নিজেই দান করব। আর প্রত্যেক নেক কাজের বিনিময় দশ গুণ।’ (বুখারি, ১৮৯৪)

এই অপরিসীম সওয়াব তখনই সম্ভব যখন রোযাদার নিজের নিয়ত এবং আমলকে পবিত্র রাখতে পারবেন। এর কারণ হলো, রোযায় লোকদেখানো ভাব থাকার সুযোগ নেই। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে এক গভীর প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে।

রোজাদারের পুরস্কারের বিষয়ে হাদিসে আসছে, ‘আবূ হুরাইরাহ (রা.) সূত্রে নবী (সা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, বানী আদমের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্যেই- সওম ব্যতীত। তা আমার জন্য, আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব। আর সাওম পালনকারীদের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিস্কের ঘ্রাণের চেয়ে অধিক সুগন্ধযুক্ত।’ (বুখারী, ৫৯২৭)

সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও সামগ্রিক কল্যাণ

রমযান কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়, এটি একটি সামষ্টিক ইবাদত। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের যেমন একক প্যারেডের পরিবর্তে দলবদ্ধ প্রশিক্ষণে বেশি শক্তিশালী করা হয়, তেমনি রমযানে গোটা মুসলিম উম্মাহর একই সময়ে পানাহার ত্যাগ ও ইফতার করার বিধান তাদের মধ্যে এক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি করে। রোযাদার ব্যক্তি যখন নিজে ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করে, তখন সে সমাজের অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের দুঃখ বুঝতে পারে। ফলে রমযানে দান-সদকা ও সহমর্মিতার এক প্লাবন বয়ে যায়। ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল রমাযানে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরীল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমাযানের প্রতি রাতেই জিবরীল (আ.) তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং তাঁরা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল (সা.) রহমতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন। (বুখারি, ৬)

সিয়াম বা রোযা হলো আত্মশুদ্ধির এক বার্ষিক মহড়া। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ও দাসত্বের পূর্ণতা প্রমাণ করে। ঈমান ও এহতেসাবের (আত্মসমালোচনার) সাথে যে ব্যক্তি রোযা রাখবে, তার জীবন হবে আলোকিত। রোযা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণার নাম নয় বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সুদৃঢ় ঢাল। আমরা যদি রোযার প্রকৃত হিকমত ও তাৎপর্য অনুধাবন করে নিজেদের চরিত্র গঠন করতে না পারি, তবে আমাদের রোযা রাখা কেবল সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না। তাই আসুন, রোজাকে কেবল ঐতিহ্যের অংশ না করে একে তাকওয়া অর্জনের সোপান হিসেবে গ্রহণ করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

আরো পড়ুন
২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন ও মুমিনের দায়িত্ব
আরো পড়ুন
জাতীয়তাবাদকে (Nationalism) ইসলামের দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ আল-আসাবিয়্যাহ (العصبية) বা জাহেলিয়াতের অপসংস্কৃতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন অনেকে। জাতীয়তাবাদকে ইসলাম বিরোধী একটি কুফরি মতবাদ বা মারাত্মক বিদআত এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন অনেক আলেমেদ্বীন। জাতীয়তাবাদ মূলত ইসলাম দ্বারা নিষিদ্ধ 'আল-আসাবিয়্যাহ' (অন্ধ গোত্রপ্রীতি/দলপ্রীতি) এর আধুনিক রূপ।
আরো পড়ুন
কুরআনে বর্ণিত 'দ্বীন' ধর্ম না জীবন ব্যবস্থা
আরো পড়ুন
রাষ্ট্রকে ইসলাম থেকে পৃথক করা ঈমান ভঙ্গের কারণ
আরো পড়ুন
Islam
আরো পড়ুন
ইবাদাত হচ্ছে আল্লাহতায়ালার বন্দেগী ও গোলামী করা
আরো পড়ুন
Scroll to Top