শেখ জিল্লুর রহমান
জন প্রতিনিধি নির্বাচন ও মুমিনের দায়িত্ব। জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সব সময়ই আমরা উপভোগ করি। একটি গণতান্ত্রিক ও মুসলিম প্রধান দেশে নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক পালাবদলের মাধ্যম নয়, বরং এটি একজন মুমিনের আমানত রক্ষা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার বড় পরীক্ষা। ইসলাম কোনো বৈরাগ্যবাদী ধর্ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (Complete Code of Life)। এখানে মসজিদ যেমন আল্লাহর ইবাদতের জায়গা, তেমনই সংসদ বা শাসনব্যবস্থাও আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং ইনসাফ কায়েমের ক্ষেত্র। তাই নির্বাচনের সময় আমাদের আবেগ বা হুজুগের বশবর্তী না হয়ে, পবিত্র কোরআনের কালজয়ী নির্দেশনার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য।
১. আমানতের সুরক্ষা ও যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন
ভোট দেওয়াকে আমরা সাধারণত নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখি, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি ‘আমানত’ এবং ‘সাক্ষ্য’। সূরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন—“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার হকদারদের (যোগ্য ব্যক্তিদের) কাছে পৌঁছে দাও।”
ভোটের মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে আমানত হিসেবে তুলে দিই। যদি কোনো অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ বা জনবিরোধী ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া হয়, তবে তা আমানতের খেয়ানত হবে। যোগ্য ব্যক্তি বলতে যিনি দক্ষ, সৎ এবং জনগণের প্রতি দরদি। অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া, যার দায়ভার পরকালে ভোটারকেও নিতে হবে।
২. সুপারিশের দায়বদ্ধতা: ভোটের ফলাফল কী?
ভোট মূলত একটি সুপারিশ। সূরা আন-নিসার ৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার করেছেন যে—“যে ব্যক্তি ভালো কাজের সুপারিশ করবে, তাতে তার অংশ থাকবে; আর যে মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, তাতেও তার অংশ থাকবে।”
আপনি যদি একজন সৎ মানুষকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন এবং তিনি যদি জনহিতকর কাজ করেন, তবে সেই সওয়াবের একটি অংশ আপনার আমলনামায় যুক্ত হবে। বিপরীতভাবে, আপনার ভোটে নির্বাচিত হয়ে কেউ যদি জুলুম, দুর্নীতি বা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তবে সেই গুনাহের ভাগীদার ভোটারকেও হতে হবে। তাই ২০২৬-এর নির্বাচনে আমাদের প্রতিটি ভোট দেওয়ার আগে ভাবতে হবে—আমি কি সওয়াব কামাই করছি না কি গুনাহের বোঝা ভারী করছি?
৩. নির্বাচনী প্রচার ও আমাদের জোটবদ্ধতা
নির্বাচনের সময় দল-উপদল এবং প্রচার-প্রচারণার হিড়িক পড়ে যায়। এই সময় কোরআনের নির্দেশ হলো সূরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াত—
“সততা ও আল্লাহভীতির কাজে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।”
প্রার্থী যেই হোক, যদি তার কর্মসূচি হয় জনগণের কল্যাণ ও আল্লাহর বিধানের অনুগত, তবে তাকে সহযোগিতা করা ইবাদত। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থে বা দলের অন্ধ মোহে কোনো মিথ্যাচার, দাঙ্গা বা সীমালঙ্ঘনের কাজে অংশ নেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ।
৪. নির্বাচিত নেতার মূল ভিশন: ৪ দফা কর্মসূচি
কোরআন আমাদের শিখিয়েছে একজন আদর্শ শাসক বা নেতার কাজ কী হবে। সূরা আল-হাজ্জ-এর ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, যাদের আমি ক্ষমতা দান করি তাদের প্রধান কাজ হবে চারটি: ১. সালাত কায়েম করা: আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সমাজ গঠন। ২. জাকাত আদায় করা: অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে দারিদ্র্য বিমোচন। ৩. সৎ কাজের আদেশ: সমাজ থেকে অন্যায় দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ৪. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ: দুর্নীতি, মাদক ও পাপাচার রোধ করা। ২০২৬-এর প্রার্থীরা এই চারটি কাজ করার মানসিকতা রাখেন কি না, তা যাচাই করা ভোটারের প্রধান দায়িত্ব।
৫. সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রতীক: মিজান ও হুকুম
ইসলামি শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। সূরা ইউসুফের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— “বিধান বা হুকুম দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই।” এই মূলনীতি অনুযায়ী আমাদের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘন করে না।
আবার সূরা আল-হাদীদ-এর ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন— “আমি রাসুলদের সাথে কিতাব ও মিজান (ন্যায়বিচারের মানদণ্ড) নাজিল করেছি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” নির্বাচনের ময়দানে ‘দাঁড়িপাল্লা’ কেবল একটি দলের প্রতীক নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের জীবনে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ঐশ্বরিক অঙ্গীকার। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রধান দায়বদ্ধতা হলো সাধারণ মানুষের জন্য ইনসাফ নিশ্চিত করা।
৬. ইবাদতের ব্যাপকতা ও নির্বাচনী আচরণ
অনেকেই রাজনীতি ও ইবাদতকে আলাদা করে দেখেন। কিন্তু সূরা আয-যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতের মর্মার্থ— “আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি”—আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতের আওতায় নিয়ে আসে।
ইবাদত মানে কেবল তসবিহ পাঠ নয়। ইসলামের পরিভাষায় ইবাদত (عبادة) হলো চূড়ান্ত আনুগত্য ও দাসত্ব। আপনি যখন লাইনে দাঁড়িয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নিয়তে সৎ প্রার্থীকে ভোট দেন, তখন সেই ভোট দেওয়াটাও একটি ইবাদত। আপনি যখন নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গিয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন না বা ভোটারদের ভয় দেখান না, তখন সেই সততাও ইবাদত। কারণ, ইবাদতের মূল ধারণা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর নির্দেশিত পথে চলা।
৭. খেয়ালখুশির অনুসরণ বনাম শরিয়ত
নির্বাচনের সময় অনেক প্রার্থী সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে মানুষের ‘খেয়ালখুশির’ (Whims) অনুসরণ করেন। কিন্তু সূরা আল-জাছিয়াহ-এর ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করেছেন যে, শরিয়তের স্পষ্ট পথ ছেড়ে অজ্ঞদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করা যাবে না। রাজনীতিতে নীতির বিসর্জন দিয়ে কেবল ভোটের জন্য আদর্শচ্যুত হওয়া মুমিনের কাজ নয়।
২০২৬ সালের নির্বাচন আমাদের সামনে একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগটি হলো সমাজ পরিবর্তনের এবং সঠিক আমানতদার নির্বাচনের। আমাদের মনে রাখতে হবে:
- ভোট একটি আমানত: এর খেয়ানত করা মুনাফিকির লক্ষণ।
- সততাই মানদণ্ড: দলের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা ও তাকওয়াকে প্রাধান্য দিন।
- ন্যায়বিচার কাম্য: ইনসাফ কায়েমে সাহায্যকারীকে সমর্থন করুন।
পরিশেষে, রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং এটি আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহেরও একটি মাধ্যম যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। আসুন, পবিত্র কোরআনের এই বিধানগুলো সামনে রেখে আমরা আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করি এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী : জামিয়া মদীনাতুল উলুম বাড্ডা, ঢাকা)