প্রযুক্তির লাগাম কার হাতে—মানুষ, নাকি অ্যালগরিদম?

প্রযুক্তির লাগাম কার হাতে—মানুষ, নাকি অ্যালগরিদম?

রেহানা ফেরদৌসী

রেহানা ফেরদৌসী

সকাল শুরু হচ্ছে মোবাইলের নোটিফিকেশনে, নাস্তার টেবিলে চোখ আটকে থাকছে পর্দায়, কাজের ফাঁকে হাত চলে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রাতে ঘুমানোর আগে বলা হচ্ছে—‘আর পাঁচ মিনিট।’ অথচ সেই পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টায় পরিণত হয়, তার হিসাব থাকে না।
একবার নিজেকেই প্রশ্ন করা দরকার—আমি ফোনটি ব্যবহার করছি, নাকি ফোনই আমার সময় ও মনোযোগ ব্যবহার করছে?
প্রযুক্তি মানুষের অসাধারণ এক সৃষ্টি। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা, ব্যাংকিং কিংবা গবেষণা—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি আমাদের কাজকে দ্রুত ও সহজ করেছে। একসময় যে কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, এখন তা কয়েক মুহূর্তেই সম্ভব। প্রযুক্তি তাই নিঃসন্দেহে সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
কিন্তু সমস্যা প্রযুক্তির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রযুক্তি আমাদের প্রয়োজন মেটানোর হাতিয়ার থেকে আমাদের অভ্যাস ও আচরণকে প্রভাবিত করার শক্তিতে পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ, আচরণ ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে তার সামনে নির্দিষ্ট কনটেন্ট তুলে ধরে। ফলে আমরা অনেক সময় মনে করি, আমিই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের মনোযোগ কোন দিকে যাবে, কী আমাদের সামনে বারবার আসবে, এমনকি কোন বিষয় নিয়ে আমরা বেশি সময় ব্যয় করব—তার পেছনেও কাজ করছে একটি অদৃশ্য প্রযুক্তিগত কাঠামো।
এটি শুধু সময়ের প্রশ্ন নয়; স্বাধীন চিন্তারও প্রশ্ন।
আজ তথ্য পাওয়া অত্যন্ত সহজ। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য মানেই জ্ঞান নয়, আর অনলাইনে পাওয়া তথ্য মানেই সত্য নয়। সার্চের প্রথম ফলাফল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় মত কিংবা AI-এর দেওয়া উত্তর—কোনোটিকেই যাচাই-বাছাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। প্রযুক্তি আমাদের চিন্তাকে সহায়তা করবে, কিন্তু আমাদের হয়ে চিন্তা করবে—এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। AI মানুষের কাজকে সহজ করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, নতুন ধারণা দিতে পারে। কিন্তু মানুষ যদি ধীরে ধীরে নিজের বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে সুবিধা একসময় নির্ভরতায় রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে নীরব পরিবর্তনটি ঘটছে আমাদের সম্পর্কের ভেতরে। একই ঘরে বসে থাকা মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ পর্দায় ব্যস্ত। বাবা-মায়ের পাশে বসেও সন্তান ফোনে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেও মনোযোগ অন্যত্র। পৃথিবীর দূর প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে যোগাযোগ সম্ভব হলেও পাশের মানুষটির অনুভূতি বোঝার সময় যেন কমে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু মানবিক উপস্থিতির বিকল্প হতে পারেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও। আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজেদের পছন্দ, অবস্থান, ছবি, যোগাযোগ ও নানা তথ্য রেখে যাচ্ছি। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এসব তথ্যের নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া তাই অপরিহার্য।
তাহলে কি প্রযুক্তি ছেড়ে দিতে হবে? অবশ্যই নয়। প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনাই করা যায় না। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে একটি সুস্থ ও সচেতন সম্পর্ক গড়ে তোলা।
প্রতিদিন কিছু সময় প্রযুক্তিমুক্ত থাকা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন কমানো, তথ্য যাচাই করা, AI-এর ওপর অন্ধ নির্ভরতা এড়ানো এবং পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অভ্যাস তৈরি করা—এসব ছোট পদক্ষেপই ডিজিটাল শৃঙ্খলার ভিত্তি হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি থেকে তাদের সম্পূর্ণ দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়; বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করতে হয়, সেটিই শেখানো দরকার।
মানুষকে সৃষ্টিকর্তা বিবেক, বিচারবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা দিয়েছেন। সেই ক্ষমতাকে নিষ্ক্রিয় করে কোনো যন্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া মানুষের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, তার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করা—মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
আজ তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন প্রযুক্তি কতটা শক্তিশালী, তা নয়। প্রশ্ন হলো—তার শক্তি ব্যবহারের সময় মানুষ নিজের বিবেক ও নিয়ন্ত্রণ কতটা ধরে রাখতে পারছে।
কারণ প্রযুক্তি আমাদের তৈরি করা হাতিয়ার। হাতিয়ারটি আমাদের হাতে থাকুক—আমরা যেন তার হাতে পরিণত না হই।
স্ক্রিন আমাদের তথ্য দিতে পারে, গতি দিতে পারে, সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু জীবনের অর্থ, সম্পর্কের মূল্য এবং কোন পথে চলব—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব মানুষেরই।
প্রযুক্তির যুগে সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হয়তো প্রযুক্তি ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেও নিজের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
পাঠকের বিবেকের কাছে তাই শেষ প্রশ্ন—
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে কতটা বদলেছে, সেটি বড় কথা নয়; বড় কথা হলো, সেই পরিবর্তনের কতটা আমরা নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করেছি, আর কতটা অজান্তেই মেনে নিয়েছি?
আজও কি আমরা প্রযুক্তির ব্যবহারকারী, নাকি ধীরে ধীরে তার নির্ধারিত জীবনের অনুসারী হয়ে উঠছি?

আরো পড়ুন
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এক নিঃস্ব তরুণের পাশে মাওলানা আব্দুল হাই
আরো পড়ুন
ভাদ্রের প্রথম সকাল: বর্ষার ভেজা পথ পেরিয়ে শরতের আগমন
আরো পড়ুন
বিশ্ব বাবা দিবসে
আরো পড়ুন
WhatsApp Image 2025-07-11 at 10.35
আরো পড়ুন
ঝিনাইদহ উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির আত্মপ্রকাশ
আরো পড়ুন
জোড় বাংলা মসজিদ
আরো পড়ুন
Scroll to Top