ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার রেললাইনের পাশে অবস্থিত মৃধা শাহাজাহান প্লাজার ১৫টি দোকান দখল করে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে আসাদুর জামান সনেট নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মোটা অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় মার্কেটের মালিককে হয়রানি করে দোকানগুলো দখলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মার্কেটের মালিক আছাদুজ্জামান মিন্টু। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সনেট দাবি করেছেন, তিনি ১৩টি দোকানের ভাড়া তুলেছেন এবং এসব দোকান পৈতৃক জমিতে নির্মিত নয়। এ ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কেটের মালিক।
অভিযুক্ত আসাদুর জামান সনেট কালীগঞ্জ উপজেলার বাদেডিহি গ্রামের মৃত আরব আলীর ছেলে। তিনি উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদের ভাতিজা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার রেললাইনের পাশে মার্কেটটি নির্মাণ করেন আছাদুজ্জামান মিন্টু। তিনি মার্কেটটির নাম দেন মৃধা শাহাজাহান প্লাজা। উপজেলার মিঠাপুকুর মৌজার ১২১, ১২২, ১২৩, ১২৪ ও ৫২৫ নম্বর দাগে পৈতৃক ১৫ শতক জমি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ নেওয়া ৯৬০ বর্গফুট জমিতে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয় বলে দাবি মালিকপক্ষের।
মার্কেটটিতে মোট ৩০টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ের জমিতে টিনশেডের ছয়টি দোকান রয়েছে বলে জানা গেছে।
২০১৮ সালে মার্কেটের পশ্চিম সারির ৩ নম্বর দোকান ভাড়া নেন আসাদুর জামান সনেট। পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি শেষ হলে ২০২৩ সালের ১ জুন আবারও চুক্তি নবায়ন করা হয়। মার্কেটের মালিকের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সনেট মার্কেটটি দখলের চেষ্টা শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ১৫টি দোকান দখলে নিয়ে সেখান থেকে ভাড়া আদায় করেন।
মার্কেটের মালিক আছাদুজ্জামান মিন্টু অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সনেট তাঁকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন। মোটা অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর মার্কেটের দোকানগুলো দখল করা হয়েছে। নিজের স্থাপনা দখল করে ‘আসাদুর জামান প্লাজা’ নাম দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মিন্টু আরও বলেন, “আমার সব কাগজপত্র বৈধ। রেলওয়ের জমিতে ছয়টি দোকান রয়েছে। কিন্তু সনেট আমার পৈতৃক জমিতে নির্মিত আরও নয়টি দোকানসহ মোট ১৫টি দোকান দখল করে ভাড়া তুলছেন। এসব দোকানের মালিকানা দাবি করার মতো তাঁর কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।”
তিনি জানান, চলতি বছরের জুন থেকে সনেট তাঁকে দোকানভাড়া দিচ্ছেন না। এ ঘটনায় গত ২০ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ আদালতে মামলা করেছেন তিনি। আদালত ১৪৪ ধারা জারি করে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও দাবি করেন মার্কেটের মালিক।
রেলওয়ের বরাদ্দ বাতিলের দাবি
এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট আসাদুর জামান সনেট ২৩ হাজার ৭৬০ টাকা জমা দিয়ে মিঠাপুকুর মৌজার ৯৩/৯৫ নম্বর দাগের ৬০০ বর্গফুট জমি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য ডিসিআর সংগ্রহ করেন। এতে স্বাক্ষর করেন পাকশীর বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম।
পরে মার্কেটের মালিক ১৫টি দোকান দখলের বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর সনেটের নামে দেওয়া ৬০০ বর্গফুট জমির বরাদ্দ বাতিল করা হয় বলে সূত্র জানায়।
বরাদ্দ বাতিলের নোটিশে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট রেলভূমির বিষয়ে রেল প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে ৬০০ বর্গফুট জমির বাণিজ্যিক রাজস্ব প্রদান বা ক্ষতিপূরণের নোটিশ সংগ্রহ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ওই জায়গায় সনেটের কোনো দখল বা স্থাপনা নেই বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
দোকানভাড়া নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা
মার্কেটের এক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সনেট এই মার্কেটেরই একজন ভাড়াটিয়া ছিলেন। আমাদের মতো একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতেন। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে শুনি, তিনি ১৫টি দোকানের মালিক হয়ে গেছেন। এখন থেকে তাঁর কাছে ভাড়া দিতে হবে, না হলে দোকান ছেড়ে দিতে হবে। এ ভয়ে তাঁকে সেপ্টেম্বর মাসের ভাড়া দিয়েছি।”
অভিযোগ অস্বীকার সনেটের
অভিযোগের বিষয়ে আসাদুর জামান সনেট বলেন, “রেলওয়ের কাছ থেকে বরাদ্দ বাতিলের কোনো নোটিশ অফিশিয়ালভাবে আমি পাইনি। আমি ওই মার্কেটের মালিকানা জায়গার এখনো ভাড়াটিয়া। গত সেপ্টেম্বর মাসে ১৩টি দোকানের ভাড়া তুলেছি। এগুলো কোনো পৈতৃক জমিতে নয়।”
অন্যের স্থাপনা দখল করে ভাড়া তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থাপনা নির্মাণের খরচ দেওয়ার বিষয়ে তিনি যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু আছাদুজ্জামান মিন্টু তাঁর সঙ্গে দেখা করেন না।
সনেটের চাচা ও কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, মার্কেটের মালিকের কাগজপত্র বৈধ নয় এবং তিনি বিগত ১০ বছর জমির খাজনা দেননি। তাঁর দাবি, সনেট রেলওয়ের কাছ থেকে ডিসিআর নিয়েছেন। স্থাপনা দখল করে ভাড়া তোলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “স্থাপনা ভাঙার কাজ চলছে।”
বিএনপিতে দখলবাজদের জায়গা হবে না: রাশেদ খাঁন
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেন, “যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, আসাদুর জামান সনেট তিনি বিএনপির কেউ নন। যাঁর মার্কেট দখল করা হয়েছে, তিনি আইনি সহযোগিতা নিলে এবং তাঁর কাগজপত্র সঠিক থাকলে অবশ্যই তাঁর পক্ষে আমার অবস্থান থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপিতে কোনো চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও মাদক কারবারির জায়গা হবে না। বিষয়টি জানার পর ভুক্তভোগীকে থানায় অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেছি।”
মার্কেটটির মালিকানা, দোকান দখল এবং ভাড়া আদায় নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে। অভিযোগের বিষয়ে আদালতের মামলা ও রেলওয়ের জমির বরাদ্দসংক্রান্ত নথিপত্রের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে প্রকৃত মালিকানা ও দখলের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

