শেখ জিল্লুর রহমান
কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা বাজারে সেতু নির্মাণকাজে ধীরগতি ও নদীতে ডাইভারশন বাঁধের কারণে অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়েছে বলে কৃষকরা ধারণা করলেও, প্রশ্ন উঠেছে শুধুমাত্র একটি বাঁধের কারণেই কি এ ঘটনা? প্রশ্ন উঠে নদীতে কয় কিলোমিটার অন্তর অন্তর স্থানীয় প্রভাবশালীরা বাঁধ দিয়েছেন, নদীর পাড় দখলের ফলে প্রস্ততা আরকতটুকু অবশিষ্ট আছে? শীত মৌসুমে নদীতে ধানচাষ যখন চলে বিবেকবানদের বুজতে বাকি থাকে না এই নদীর গভীরতা কতটুকু! যে নদীর গভীরতাই নাই তার পানি ধারণ ক্ষমতা কতই বা হবে? আমি তিন যুগেও কালীগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা, বেগবতী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কোনো কাজ দেখি নাই। কিছু বছর আগে বারোবাজারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়ি ভৈরব নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে খননকাজ করলেও এ ভৈরব নদীর মাঝে এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রায় ২ একর ৩৫ শতক নদী দখল করে তৈরি করে বড় একটি পুকুর তৈরি করে মাছা চাষ করে, ফলে হুমকির মুখে পড়ে নদীর প্রবাহ। এতে নদী খননের মূল উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্তসহ পাল্টে যায় নদী খননের ম্যাপ। বিষয়টি দাড়িয়েছে নদীর পাশে আমার জমি, নদীর অর্ধেক আমার দাবি। আমি নেতা নদী দখল আমার পেশা।
আপনারা ভাবুনতো বেগবতী কি এখন আর নদীর মতো দেখায়? না নদীগুলি এখন এক একটি খাল, তাও পূর্ণ হয়েছে কচুরিপানায়, পরিণত হয়েছে ময়লা ফেলার ভাগাড়ে, শুষ্ক মৌসুমে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ধান চাষ ও নদীর মাঝে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ। বিল থেকে নদীতে পানি আসার মাধ্যম খালগুলি আর নেই । রাজা শশিভূষণের গোমস্তা ও আমার প্রপিতামহ শেখ জমির উদ্দিনের সঙ্গে আমার বাবা তার কৈশর জীবনে এই বেগবতী দিয়ে নৌকা চালিয়ে তৈলকূপ গ্রাম থেকে রাজবাড়ী দেখা করতে যেতেন। ভাবুন সে সময়ে এ নদীর অবস্থা কেমন ছিল, আর এখন কেমন?
আমার জীবনের ৩ যুগেও কখনো কোনো জনপ্রতিনিধিকে দেখি নাই একটি বিলের সঙ্গে আর একটি বিল এবং বিলের সঙ্গে নদীর সংযোগ খাল খননে বরাদ্ধও দিতে, কিন্তু প্রতি বছরই খাল ও নদী খননের জন্য সরকার বিভিন্ন সময়ে বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
একটি বিলের সঙ্গে অপর একটি বিলের সংযোগ খাল বা বিল থেকে নদীপর্যন্ত আসা খালের কি অবস্থা? পানি নদীতে আসবে কি ভাবে? নদীর গভীরাতা কতটুকু? ফলে সারাবছর এই পানি নদী ধারণ করবে কিভাবে? সাধারণত অতিবৃষ্টির পানি নদীতে আসার পর অতিরিক্ত পানি বড় নদীতে নিষ্কাশন শেষে সারাবছর একটি অংশ নিজে ধারণ করে, তা কি সম্ভব, আপনারা কি সে অবস্থায় রেখেছেন? পারিবারিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গ্রামের অসৎ নেতাদের পিছু ছুটাই যখন আপনাদের কাজ তখন আপনারা কিভাবে তা থেকে দূরে থাকবেন। দখলে প্রতিযোগিতা করাই হবে আপনাদের প্রধান পেশা। তাদের চাঁদা ও অবৈধ উপার্জিত টাকা নির্বাচনের সময় আপনাদের মাঝে ছিটিয়ে ভোট সংগ্রহ করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর এ সংস্কারগুলি তারা কি করেছেন? গত তিন দশকে আমি বা আমরা দেখি নাই। তার আগে কেউ দেখেছেন কি না জানি না।
সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও যশোরের পার্শবর্তী জেলায় তাপমাত্রা বেড়েছে দ্বিগুন, নলকূপ ও সেলো মেশিন থেকে পানি না উঠার কারণও নদীর নাব্যতা। বর্তমানে খাল, বিল, নদী নালা থেকে মাছ ধরার সে প্রতিযোগিতা কল্পনাতীত।
সেতু নির্মাণের জন্য বেগবতী নদীতে বাঁধ দেয়ায় নদীর স্বাভাবিক স্রোত বন্ধ হয়ে গেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে দায়সারা যে রিপোর্ট করা হয়েছে, স্থানীসাংবাদিকরা তাতেই সীমাবদ্ধ। পোস্ট এডিটোরিয়াল, স্থানীয় দৈনিকে এডিটরিয়লের বালায় নাই। পরিবেশ সংগঠনগুলোর কোনো তৎপরাতা লক্ষণীয় নয়।
শুধুমাত্র ৩৫-৪০ ফুট চওড়া কাঠের সেতুর কারণেই যে নদীর পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না তা বলা ঠিক নয়। যে দিক থেকে পানি প্রবাহ সে দিকে নদীর দুকূলে পানির প্রবাহ কি খুব বেশি, তা কিন্তু নয় ফলে এটা বলা যাচেছ বিল থেকে খাল হয়ে নদীতে পানি আসার কোনো মাধ্যম নাই, নদীগুলির গভীরতা ও বিভিন্ন অংশে বাধের কারণে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।
সুতরাং, আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে কোন প্রার্থীকে গুরুত্ব দিতে হবে। সৎ ও যোগ্য ব্যক্তির পাশাপাশি এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে যিনি পরিবেশের ওপর বেশি গুরত্ব দিবেন, স্থানীয় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবেন তাকেই গুরত্ব দেওয়া। দলকানা অর্থাৎ পালের গোদা যে দিকে যান পরিবারের বাকিরা সেই দিকে যাওয়া বন্ধ না করতে পারলে এ অবস্থার সম্মূখীন হরহামেশাই হতে হবে।